Wednesday, October 9, 2019

***নরম বউ থেকে শক্ত বউ***

এক ছিল এক লোক। সে তার বুড়ো মাকে নিয়ে একটি দোতলা বাড়িতে থাকত। সে এখনো বিয়ে করেনি। একদিন তার বিয়ে ঠিক হলো। ছেলের মা অনেক দেখেশুনে শান্তশিষ্ট ও নম্র-ভদ্র দেখে একটা বউমা নিয়ে আসলেন। ছেলেটির মা কিন্তু খুব একটা সুবিধার ছিল না। যদিও সে ছেলের উপার্জনেই চলতো, তাও সে ছেলের টাকা নিয়েই কিপটেমি করতো। কাজের লোক রাখলে অনেক টাকা যায়। তাই সে নম্র-ভদ্র বউ নিয়ে আসলো, যাতে তাকে দিয়ে অনেক কাজ করানো যায়। বিয়ের পর মেয়েটি বাপের বাড়িতে গেল। আর বুড়ো মা দিন গুনতে থাকলো, কখন সে বাড়িতে ফিরে আসবে। একদিন বউ বাড়িতে এলো। তখন ছিল ঘর ভর্তি মানুষ। তাই বুড়ো মা ভালো ব্যবহার করতে শুরু করলো। সে প্রথমে বউকে ডেকে নিয়ে সোফায় বসালো। তারপর যদিও তার অতটা কষ্ট হচ্ছিল না, তবুও সে খারাপ লাগার ঢং করতে লাগলো। এবং এমন ভাব দেখাতে লাগলো যে, তার সারা শরীর ব্যথা করা অবস্থায়ও অনেক কষ্টে বউয়ের জন্য খাবার বানিয়ে এনেছে। সবাই তাকে দেখে অনেক থামানোর চেষ্টা করলো। বউও অনেক চেষ্টা করলো তাকে থামানোর জন্য। কিন্তু সে কি আর ঘরভর্তি মানুষের মধ্যে তার আসল চেহারা দেখাবে? সেও জোর করে বউয়ের জন্য নাস্তা দিল। সবাই মানা করলে সে বলল, "নতুন বউ বলে কথা! একটু রেঁধে তো খাওয়াতেই হবে। আমরা সারাজীবন কষ্ট করেছি বলে কি আমার বউমাকেও কষ্ট দিতে পারি? আমি দু:খী ছিলাম বলেই তো বউয়ের দু:খ বুঝি, তাই তার গায়ে ফুলের টোকাটিও লাগতে দেব না।" সবাই শাশুড়ীকে দেখে মুগ্ধ হলো। অনেকে মনে মনে ভাবলো, "ইস! আমার মেয়ের জন্য যদি এরকম শাশুড়ী পেতাম! কতই না ভালো হতো!" মানুষ যখন সবাই চলে গেল, শুধু ছেলে ছিল, তখনো শাশুড়ী ভালোই সেজে ছিল। আর মনে মনে বলতে লাগলো, "ইস! ছেলেটা কখন যাবে? আমার আর ঢং করতে ভালো লাগে না! এক কাজ করি। খোকাকে একটু এগিয়ে দেই।" এরপর সে খোকাকে বলল "চল্ বাবা, আজকে একটু তোর খালার বাড়িতে যাবি না?" শাশুড়ী চেয়েছিল যে, খোকা একা খালার বাড়িতে যাবে। কিন্তু খোকা আরো বলল, "বেশ ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছ, মা! চল, সবাই রেডি হয়ে নাও। নতুন বউকে তো খালাকে দেখাতেই হবে। তুমি এত কষ্ট করলে। যেতে পারবে তো? হাত-পা অনেক ব্যথা করছে। তুমি বাসায় বসে একটু রেস্ট নাও। আমি বরং তোমার বউমাকে নিয়েই ঘুরে আসি। তাছাড়া একটুখানি রাস্তা, কোন রিক্সা বা কিছুও তো যেতে চাইবে না। কিন্তু তোমার কাছে তো পথটা অনেকই বেশি। তাছাড়া তিনজন একটা রিকশায়ও ধরবে না। তুমি বরং রেস্ট নাও, আর আমরা ঘুরে আসি।" এই বলে ছেলেটা বউকে নিয়ে খালার বাড়িতে বেড়াতে গেল। শাশুড়ী তো এত রেগে গেল যে, একটা প্লেট ভেঙ্গে ফেলতে নিল। কিন্তু ভাগ্য ভালো, প্লেটটি ভাঙ্গেনি। এরপর সে নিজেই প্লেটটি তুলে রাখল। অন্য কোন প্ল্যান করতে লাগল। সে তার মেয়েকে ফোন দিল। মেয়েকে বলল, "ভালো আছিস তুই? আচ্ছা শোন্। আমি চেয়েছিলাম, বউমা বাড়িতে থাকুক। কিন্তু তোর ভাই তাকে নিয়ে খালার বাড়ি বেড়াতে গেল। আর বউয়ের কেমন কথা? চলে গেল আমাকে রেখে। ফিরেও তাকালো না। তুই যদি আসিস, তোর সাথেও খারাপ ব্যবহারই করবে। অতএব, কিছু একটা করতে হবে। কি করা যায়, তার জন্যই তো তোকে ফোন দেয়া।" মেয়েটি বলল, "তাই নাকি? তবে এক কাজ কর। তোমার কাছে টাকা আছে না? আর কাজের মেয়ে আছে তো? তুমি তাকে দিয়ে অসুস্থ হওয়ার ওষুধ কিনে আন। গুড়োটা আনতে ভুলো না। এবং এমনটা আনবে, যা খাবারে ছিটিয়ে দিলে উপর থেকে কিছু বোঝা যায় না।" মা বলল, "কিন্তু কাজের মেয়ে তো নেই। ওকে তো বউ আনার দু'দিন আগেই বিদায় দিয়েছি। ছেলেকে বলেছিলাম যে, আমি আর বউমা মিলে কাজ করবো। কিন্তু এখন দেখছি, অবুঝ ছেলেটি শুধু বউ নিয়ে পাড়া পাড়া বেড়ায় ও না বুঝেই আমাকে কেমন করে যেন শায়েস্তা করে ফেলে! ছেলেটাকে নিয়ে আর পারা গেল না! তবে তাতে কি হয়েছে? সত্যি সত্যি তো আর অতটা ব্যথা নেই। নিজেই পারব দোকান থেকে কিনে আনতে। আচ্ছা রাখি, এক্ষনি কিনে আনি।" এই বলে ফোন রেখে সে নিজেই গেল নিচে। কিনে আনল সেই ওষুধ। এরপর সে বউমাকে ফোন দিল। বলল, "তোমরা কি খেয়ে আসবে, নাকি এসে খাবে?" বউমা বলল, "খালাশাশুড়ীর বাসায় এসেছি তো। না খেয়ে কি যাওয়া যায়? তা তো যেতে দেবে না, আগে থেকেই বলেছে। আপনি আবার রান্না করবেন না কিন্তু।" এবার শাশুড়ীর মাথায় আরেকটা বুদ্ধি এল। সে ডেজার্ট (খাবার পরের মিষ্টান্ন) বানানোর চিন্তা করলো। সে তিন রকমের তিনটা মিষ্টি বের করলো। তার ছেলের পছন্দের মিষ্টিটা ছেলে সাধারণত যেই চেয়ারে বসে সেই চেয়ারের সামনে রাখলো। আর নিজেরটা নিজেরটার সামনে রাখল। এবং বউয়েরটাতে ঐ ওষুধ ছিটিয়ে একটি মিষ্টি রাখল। একটু পর তার ছেলে ও বৌমা এলো। ছেলেকে বলল, "দেখ বাবা, মিষ্টি বের করে রেখেছি। এটা তোর পছন্দের, খেয়ে নে। আর বউমাকেও ঐ মিষ্টিটা দে।" এই মুহূর্তে বউয়ের ফুপুশাশুড়ী এলো। বউমা অতি ভদ্র হওয়ায় নিজের মিষ্টিটা ফুপুশাশুড়ীর কাছে একদম দিয়ে দিল। ফুপুশাশুড়ী আবার মিষ্টিপাগল ছিল। সে আবার 'না' বলল না। শাশুড়ী 'থাক' বলার আগেই গপ করে মিষ্টিটা গিলে ফেলল। শাশুড়ীর তো এবার আক্কেল গুড়ুম। এবার কী হবে? বউয়ের বেলায় না হয় অন্য কিছু দিয়ে এটাকে ঢেকে দেয়া যেত। কিন্তু আমার ননদ তো আমাকে বিয়ের পর থেকেই অনেক ভালোবাসে, অনেক বিশ্বাস করে। সে তো আমাকে ভালোভাবে চেনে যে, আমি সবকিছু ভালোভাবে ঠিক আছে কিনা দেখে তাকে খেতে দেই। এখানে তো আর date expire এর অযুহাত চলবে না। এবার কি করা যায়? একটু পর শাশুড়ী লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েকে আবার ফোন দিল। পুরো ঘটনাটা বলল। মেয়ে রাগ হয়ে বলল, "তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হয় না। প্রথমে বউ আসার সাথে সাথে মুখে ঢুকিয়ে গিলিয়ে দিতে! এখন তোমার যা করার কর, আমাকে আর ফোন দিও না। একটা বুদ্ধি দিয়েছি, সেটাও ঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারনি, অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। শেষে আবার তোমাকে বুদ্ধি দিতে গিয়ে আমার জেল-হাজত না হয়। যা ভালো বোঝ, তাই কর।" এই বলে নাক ঘুচিয়ে মেয়েও ফোন কেটে দিল। একটু পর ছেলের ফুপুর এমন মাথাব্যথা শুরু হলো যে, সে চিৎকার করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলল। বউমা তো খুবই ভয় পেয়ে গেল। আর ছেলে এমন ছিল, যে তার ফুপুর কাছের আর যত আত্মীয়-স্বজন আছে, সবাইকে ফোন করে জানালো। অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদেরকেও জানিয়ে দিল। এবং তাকে দেখার জন্য আসতে বললো। সবাই আবার চলে এলো বাড়িতে। তখন আরো অসুখ বাড়তে থাকল। সবাই ভয় পেয়ে গেল। এবং ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো, "কিভাবে তোমার ফুপুর এত অসুখ হলো? সে কি কিছু খেয়েছে, না কি হয়েছে?" ছেলে বলল, "আগে কি খেয়েছে, তা তো জানি না। তবে আমি খালার বাড়ি থেকে আসার পর মা আমাদের জন্য মিষ্টি দিল। আর আপনারা তো জানেনই যে, আমার ফুপু মিষ্টিপাগল। তো বউমা তার নিজেরটা ফুপুকে সাধতেই তিনি আর 'না' করতে পারেননি। সেটা খাওয়ার পর থেকেই তো এই অবস্থা।" এবার কিছু কিছু আত্মীয়রা শাশুড়ীকে সন্দেহ করলো। তারা সবাই মিলে উক্ত শাশুড়ীটাকে ঘিরে ধরলো, "মিষ্টিতে কী ছিল, বলুন তো দেখি!" শাশুড়ী বলল, "মনে হয় date expire ছিল।" তখন ফুপু বললো, "date expire! আমি তো তোমাকে সবসময় এভাবে বিশ্বাস করি যে, খাদ্য নির্বাচনে তোমার অন্তত ভুল হয় না। আর তোমার নিজেরটা date expire হলো না, শুধু বউমার জন্য যেটা রেখেছ সেটাতেই date expire হলো, এ কেমন কথা! এসব মিষ্টি তো এক প্যাকেটেরই হওয়ার কথা।
জনসমক্ষে এভাবে ধরা খেয়ে লাঞ্ছিত হয়ে বেচারীর সকল রাগ গিয়ে পড়লো ছেলের উপর। সে মনে মনে ভাবলো, "এই উজবুক ছেলেটাই যত নষ্টের গোড়া! সেও দেখি না বুঝেই আমার বিরুদ্ধে যাচ্ছে। ছেলে, বউ- দুজনকেই শায়েস্তা করতে হবে।" এদিকে কিছুদিন পার হয়ে গেল। খবর আসলো, বউয়ের চাচা অসুস্থ। তাই বাপের বাড়ি যেতে হবে। আর ছেলের অফিস থাকায় ছেলে যেতে পারল না। মেয়েটি চাচার কাছে দুই দিন থাকলো। এরপর এখন চাচা মোটামুটি সুস্থ। চাচার পাশের বাড়িটির লোকেরা একদিন সবাইকে দাওয়াত দিল। মেয়েকে, মেয়ের মা-বাবাকে ও তার চাচাকে। তারা পাশের বাড়িতে গেল। পাশের বাড়িতে আবার এ মেয়েটির সমবয়সী আরেকটি মেয়ে ছিল। তারা গল্প-গুজব করতো সুযোগ পেলেই। পাশের বাড়ির ঐ মেয়েটি ছিল বেশি চালাক। তার সাথে থাকতে থাকতে এ মেয়েটিও চালাক হয়ে গেল। এবার সে আবার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে এলো। সে ঐ মেয়েটির কাছে শিখেছিল, সবসময় চোখ-কান খোলা রাখতে ও বুদ্ধি খাটাতে। বোকা হয়ে থাকলে চিরদিনই মার খেতে হবে। বউকে দেখে বর খুশি হয়ে বলল, "তোমার চাচা সুস্থ হয়েছে তো? আর তুমি সুস্থ আছ তো?" মেয়েটি বলল, "হ্যাঁ, সবাই সুস্থ আছি। তুমি খেয়েছ?" ছেলে বলল, "না, এখনো খাইনি। তবে খাব। তুমি এতদিন গিয়ে বাপের বাড়ি থাক? কেমন লাগে!" মেয়েটি অবাক হয়ে গেল। সে দেখল, আমি তো মাত্র তিনদিন ছিলাম। তাহলে বর এরকম রাগ হচ্ছে কেন! এর রহস্য আমাকে বের করতেই হবে। এর মধ্যে নিশ্চয়ই ওকে ব্রেনওয়াশ করা হয়েছে। এরপর থেকে বাপের বাড়ি যাবার সময় এর রহস্য উদঘাটনের বন্দোবস্ত করে যেতে হবে। এক কাজ করি! আমি কাল একটু মার্কেটে যাই। সিসি ক্যামেরা কিনে আনি। এমন একটা কিনতে হবে, যেটাতে ছবির সাথে শব্দও রেকর্ড হয়। কালকে যাওয়ার কি দরকার, আজকেই যাই। কিন্তু তাহলে আবার কেমন হয়? থাক, কালকেই যাব। এখন বরং সবকিছু গোছগাছ করে ফেলি। পরের দিন মেয়েটি একটা সিসি ক্যামেরা কিনে আনল। সাথে কিছু টুকটাক জিনিসও নিয়ে আসল, যাতে কোন সন্দেহ না হয়। এবার ছেলে গেল অফিসে। সেই ফাঁকে মেয়েটি ঘরের এক কোণায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করলো। তিন মাস পর মেয়েটি আবার বাপের বাড়ি গেল। এবার গেল এমনি বেড়াতে। এবার দেখা গেল, ছেলেটির ডিউটি পড়েছে। তাই সে এবারও যেতে পারল না। আর সে ডিউটির তারিখ চেঞ্জও করা যাবে না। মেয়েটি চারদিন পর আবার ফিরে এলো। কেউ যখন ঘরে ছিল না, তখন সে সিসি ক্যামেরাটির সবকিছু দেখল। সে দেখল, ছেলেটিকে তার মা বলছে, "জানিস তুই, তোর বউ কত দায়িত্বহীন? আমার মত বুড়ো মানুষটাকে রেখে দিনের পর দিন বাপের বাড়ি পড়ে থাকে। এই ক'দিন আগেই তো চাচাকে দেখতে গিয়েছিল। আবার যাওয়া দরকার কিসের? তাও আবার তোর ডিউটি, এরকম সময়ে তোকে রেখেই গেল। সে বার বার যায়, যেন আমাকে সেবা করতে না হয়। একটা ফাঁকিবাজ কামচুরনী বউ তোর কপালে জুটেছে। আমি আছি বলে তোকে রেঁধে খাওয়াতে পারছি, আমি না থাকলে যে তোর কী দশা হবে, সেই চিন্তায় আমার ঘুম আসে না!" এরকম আরো অনেক কথাই শুনতে পেলো সিসিটিভির ফুটেজ থেকে। এবার সে দেখল, ছেলেকে অফিসে যেতে। এবং দেখল, মা তার মেয়েকে ফোন করে বলছে, "জানিস মা, কাজের কাজ করেছি! ছেলেটাকে ফুলিয়ে দিয়েছি। তার বউয়ের ব্যাপারে তার মাথা এমনভাবে বিগড়ে দিয়েছি যে, সে আর বউয়ের কথামতো কিছুই করবে না। এবার একটা কথা চিন্তা করেছি। কালই তো বউমা আসবে। আমি বরং দুটি ডিমভাজায় এমন জিনিস মিশিয়ে দেব, যাতে তা খেয়ে দু'জনেরই মাথা গরম থাকে। ফলে তাদের মাঝে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকে।" এ জিনিস দেখে বউ তো অবাক! সে ফ্রিজে গিয়ে দেখল, ঠিক ঐ জায়গায়ই ডিম ভাজা দুটো আছে। আর এখন তো রাত, রাতের খাবারও খাওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই এটা আমাদের কাল সকালে খেতে দেবে। আমি বরং একটা ডিমভাজা ফেলে দেই, ও আরেকটি শাশুড়ীর জন্য রাখি। আর আমাদের জন্য একটা একটা করে ভেজে নেই। এবার সকাল বেলা বউ অনেক সকালে উঠে দুটো ডিম ভেজে নেয়। আর ঐ একটা ডিমভাজা শাশুড়ীর চেয়ারের সামনে রেখে দেয়। আর নতুন করে ভাজা দুটো ডিম ফ্রিজের বাটির মধ্যে রেখে দেয়। এবার সে আবার ঘুমোতে যায়। সকাল বেলা শাশুড়ী ওঠে। তারপর বউ ও ছেলেও ওঠে। তারা সবাই খেতে আসে। শাশুড়ী বলে, "তোমাদের দু'জনের জন্য ফ্রিজে ডিম ভাজা রেখেছি, খেয়ে নাও।" বউ বলল, "ও আচ্ছা! আমি তো ভেবেছিলাম, আমরা আজ আর ডিম খাব না। তাই আপনার জন্য একটা ডিম ভেজেছি। যখন আপনি আমাদের জন্য ভেজেইছেন, তখন খেয়েই নিই।" খাওয়া শেষ হওয়ার পর সবাই রেস্ট নিতে গেল। একটু পর থেকে শাশুড়ী কেমন যেন আচরণ করতে লাগলো। কিছু একটা হলেই বলতো, "থাকব না আর এই ঘরে। যেদিক দু'চোখ যায়, সেদিকে পাড়ি জমাবো।" অবস্থা বেগতিক দেখে আত্মীয়-স্বজনরা সবাই মিলে শাশুড়ীকে পাবনায় নিয়ে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে দিল। আর বোকা ছেলে ভাবলো, "আমার মায়ের জন্য এটাই ভালো। আমদের সাথে থাকতে তো তার বোধহয় কষ্ট হচ্ছিল। এবার আমার বউটাও কাজ করা শিখে সোজা হয়ে যাবে। ও আমরা সবাই ভালোভাবে থাকবো।" কিন্তু ছেলে এটাই এখনো বোঝেনি যে, তার বউ আগে থেকেই অনেক কাজ পারে। এরপর থেকে সবাই সুখে-শান্তিতে বাস করতে লাগলো।

Wednesday, August 28, 2019

শাপে বর

এক ছিল এক মহিলা। তার ছিল দুই মেয়ে। বড় মেয়ে রিতা ও ছোট মেয়ে মিতা। কিন্তু মহিলাটি মিতাকে কেন যেন বেশি ভালবাসত। সবসময় তার জন্য সেরা জিনিসটা দিত। কারণ, রিতার চেয়ে মিতা অনেক বেশি মডার্ন ছিল। মিতা ছিল খুব চঞ্চল ও নামকরা। তাকে যারা যারা পছন্দ করত, তারা তাকে গিফট বা টাকা দিত। আর মেয়ের ভাগ তো শুধু মেয়ে খায় না, মাও খায়। এজন্যই মিতাকে মা বেশি পছন্দ করত। আর রিতা ছিল নিতান্ত সাধারণ মেয়ে। কিন্তু তার রূপ-গুণ সব ছিল ভাল। শুধু মডার্ন ছিল না সে। এখন তারা বড় হয়েছে। একদিন মহিলাটি তার দুই মেয়েকে ডেকে বলল, "তোরা শোন। তোরা এখন বড় হয়েছিস। তোদের কাজ করে টাকা আয় করতে হবে। তার অবশ্য ব্যবস্থা আমি করেছি। রিতা, তুই পাশের বিল্ডিংয়ের ঐ সাধারণ পরিবারে কাজ করবি। আর মিতা, তুই ঐ বড়লোকের যে বাড়িটা দেখছিস, সেখানে দুটো বাচ্চাকে পড়াবি। তাদের সাথে আমি কথা বলেছি। সবাই টাকা দেবে বলেছে। রিতা যেখানে কাজ করবে, সেখানে বেতন ততটা বেশি নয়। কিন্তু মিতার কিন্তু ফাটিয়ে দেয়ার মত বেতন। আজ বুধবার, এই শনিবার থেকে তোরা কাজ করবি। টাকা আয় করবি। আর আমার কথাই কিন্তু মানতে হবে।" শনিবার সকালে রিতা ও মিতা দু'জনই নিজেদের কাজ করার জায়গায় পৌঁছে গেল। মিতা প্রথমে তার কাজের জায়গায় ঢুকেই উষ্ণ সম্বর্ধনা পেল। বাচ্চা দুটোও খুশী। নতুন টিচার এসেছে। এবার মিতা তার কাজ করা শুরু করল। বাচ্চা দুটিকেই প্রথমে বাড়ির কাজ করালো। আর ওদিকে রিতা বাড়িতে ঢুকল। ঢোকার পর সেই বাড়ির মালিক বলল, "তুমিই কি সেই কাজের মেয়ে? ঠিক আছে, ভিতরে এসো। তুমি কি সকালে খেয়েছ?" রিতা বলল, "মা যা দিয়েছে, তা খেয়েছি।" মালিক বলল, "কি দিয়েছে?" তখন রিতা উত্তর দিল, "একটা পোড়া রুটি আর এক চামচ বাসি ডাল।" মালিক অবাক হয়ে বলল, "কি বলছ তুমি? এটা কেমন কথা? এসো তোমাকে এই রুটি ও ডিম ভাজা দেই।" রিতা খাওয়া শেষ করল। মালিক বলল, "তুমি আসবে দেখে আমি ছোট রুমটা খালি করেছি। রুমটা একটু নোংরা, তবে কিছু মনে করো না। বিছানাটা পরিস্কার আছে। এখন গিয়ে বিশ্রাম নাও, তারপর না হয় ঘরটা একটু মুছে দিও।" রিতা মালিকের কথামতো কাজ করল। একটু পর দুপুরের খাবারের সময় হলো। বাড়িতে রান্না হলো ভাত আর গরুর মাংস। রিতা রেস্ট নেওয়া অবস্থায়ই মালিকের বউ সব রান্না করেছে। মালিকের ছিল একটি শিশুপুত্র। বয়স ছিল তিন। সেও রিতাকে খুব পছন্দ করেছে। মালিকের বউ রিতাকে বলল, "তোমার তেমন কিছু করতে হবে না। তুমি শুধু দুপুরের খাবারটা পরিবেশন করে দাও। আর শেষে একটু বাসনগুলো মেজে দিও। আর তারপর কিছু করতে হবে না। শুধু আমার বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়িয়ে তার পাশে শুয়ে থেকো। কাজগুলো বেশি মনে হলে কিছু মনে করো না।" রিতা তো অবাক! এমন মালিক আবার হয় নাকি? সে মালিককে বলল, "আপনি ঠিক আছেন তো? আমি কিন্তু কাজের মেয়ে। আমার নাম কিন্তু রিতা।" মালিক বলল, "আমার বউ তো ঠিকই বলেছে। এত কাজ! তোমার একা হাতে করা কি সহজ? আর আমাদের একটা অভ্যাস আছে, আমরা কাজের মেয়ে হোক, মেহমান হোক, সবার সাথেই ভালো আচরণ করার চেষ্টা করি। তাছাড়া তোমার বেতনটা তো তত বেশি নয়, তাই খারাপই লাগছে তোমার জন্য।" রিতার তো মাথা ঘুরে যাচ্ছে। সে অবাক হয়ে আছে যে, "তার মালিক এত ভালো কি করে হলো? তাছাড়া তার মা তাকে এত ভাল মালিকের কাছে দেবে? মা মনে হয় বেতন কম দেখেই আমাকে এখানে দিয়েছে। মালিক এত ভালো- বুঝলে হয়তো এখানে দিত না।" এরপর রিতা মালিক ও তার বউয়ের সব কথামতো কাজ করলো। আরামেই তার দিন কেটে যাচ্ছিল। 
এবার আবার আসা যাক মিতার কথায়। শুরুর দিকে মিতাকে ভালোভাবে বরণ করে নিলেও পুরোটার যে ভাল হবে এর কোন গ্যারান্টি নেই। মিতা বাচ্চাদের পড়ানো শেষ করল। দুপুরের খাবারের পালা। সবাই খেতে বসল। মিতাও এসে খেতে বসল। ডাকার অপেক্ষাও করল না। মালিক বলল, "এই মেয়ে! এত বেতন নিয়ে এসেছো, আবার খাবারও কেন দিতে হবে? এসেছো, তা খাবার আনবে না? যাও, হোটেলে গিয়ে খেয়ে এসো। আর পার্সেল করে আর দু'দিনের খাবারও নিয়ে এসো। এটা ভেবো না যে, এত বেতন পাবে, তার উপর আবার ভালো ভালো খাবারও পাবে বসে থেকে।" মিতা তো খুবই Shocked হয়ে গেল। তার এখন ইচ্ছে করছে, মায়ের পিঠে ধাম্মুর ধুমুড় কিল মারতে। তাও এখন আর কি করার। মালিকের কথামতোই কাজ করলো। 
মিতার ছাত্র বাচ্চা দুটো ছিল আবার খুবই দুষ্ট। একদিন তাদের দুষ্টুমি সহ্য করতে না পেরে মিতা দু'জনকেই ধরে পিটালো। শব্দ পেয়ে মা-বাপ দৌড়ে এলো। তারা রাগ হয়ে মিতাকে তাড়িয়ে দিল। মিতা এমনিতেই রাগে টিকতে পারছে না। পথে আবার উঁকি মেরে দেখতে পেল, রিতা বসে বসে ঘুমোচ্ছে আর তার মালিকের বউ কাজ করছে। তার রাগ দ্বিগুণ হয়ে গেল। বাড়ি গিয়ে যখন মায়ের কাছে আসল, মা বলল, "কই রে মা, মিতা? বেতনগুলো দে হাতে।" এতে তার রাগ তিনগুণ বেড়ে গেল। সে রেগে গিয়ে টাকাগুলো বের করে মায়ের মুখের উপর ছুঁড়ে মারল, "এই নে, তোর টাকা! খালি তো টাকা চাস। মেয়ে কোথায় কেমন থাকবে, সেটাও জান না? রিতাকে এই বাড়িতে কাজ করতে দিলেই পারতে। রিতাকে দেখে আসলাম রাজার হালে আছে!" মা রেগে গিয়ে বলল, "তাই নাকি? কোথায়? দেখি তো গিয়ে!" মা আর ছোট মেয়ে রিতার কাজের বাড়িতে গেল। গিয়ে তারা মালিককে ধরল। বলল, "এ কি করছেন? কাজের মেয়েকে শুইয়ে রেখে নিজেরা কাজ করছেন? এ কেমন বিচার?" এরপর মালিক রিতার এখানকার কাজের ডেইলি রুটিনটা বলল। কিন্তু তা শুনেও তার মা-বোনরা সন্তুষ্ট হতে পারল না। বলল, "এত কম কাজ! সে তো আমিও করতে পারি।" ছোট মেয়েও বলল, "এত সোজা কাজ যে আমিও করতে পারি।" মালিকেরা সব বুঝতে পারল। তারা বলল, "পারেনই যখন। এখন থেকে এ সব আপনারা দু'জন মিলে করবেন। আর রিতাকে আমরা মুক্ত করে দেব। রিতার মত কম বেতন পাবেন, কিন্তু সমস্ত কাজ করতে হবে।" এবার মা ও ছোট মেয়ে মনে মনে ভাবল, "ইস! কথাটা বলতে গিয়ে তো ফেঁসে গেলাম। কিন্তু রাজি না হলেও তো মান-সম্মান থাকে না।" তাই এখন থেকে মিতা ও তার মা খেটে মরে, আর রিতা ঐ বাড়িতেই ওখানকার সদস্য হিসেবে আরামে থাকে।

Friday, May 31, 2019

**খাদ্যশূন্য দেশ ও খাদ্যপূর্ণ দেশ**

কোন এক জায়গায় পাশাপাশি ছিল দুইটি দেশ। একটি দেশ হচ্ছে খাদ্যশূন্য দেশ, আরেকটি দেশ হচ্ছে খাদ্যপূর্ণ দেশ। খাদ্যশূন্য দেশের রাজা খুবই নরম মনের ছিলেন। কিন্তু তার রাজ্যে খুব কম খাবার ছিল। আর অন্য দেশের রাজা ছিল হিংসুটে আর দেমাগী। তবে তার রাজ্যে খাবার ছিল ভরপুর। কিন্তু ভরপুর খাবার ছিল বলতে সারা রাজ্যে অনেক ফসল-টসল এসব কিছু না। তাদের কাছে ছিল যাদুর সিন্দুক। সেই সিন্দুক প্রতিদিন ভোর ৪টা ২০ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে খুলতে হতো। তাহলে সেখান থেকে যত খুশি খাবার বের করা যেত। একটা সরালে নিচের দিকে আরেকটার জন্ম হয়। রাজা এই কাজ দেন কয়েকজন মানুষকে। তাদের গ্রুপের নাম ফুড কালেক্টর টীম। তারা প্রত্যেকদিন ৪ টা বাজে ওখানে গিয়ে অপেক্ষা করে। এবং অনেক ট্রাক নিয়ে আসে ও তাতে খাদ্য ভর্তি করে নিয়ে যায়। এবং পুরো দেশে সাপ্লাই দেয়। কিন্তু রাজার ছিল এক অদ্ভুত আর হিংসুটে নিয়ম। রাজা নিয়ম করে দেয় যে, কেউ এ খাবার অন্য কোন দেশেই দিতে পারবে না। এমনকি তাদের কাছের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িও যদি দেশের সীমানার বাইরে হয়, তাদেরকেও খাবার দেয়া যাবে না। দিলে হবে তিন বছরের কারাদণ্ড। আর একই ভুল দু'বার করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর অন্যদিকে খাদ্যশূন্য দেশে খাবার বলতে কিছুই ছিল না। শুধুমাত্র ছিল একটি ছোট্ট তরমুজের ক্ষেত। পুরো দেশে ওটাই একমাত্র খাদ্যের উৎস। লোকে মনে করে, অনেকদিন আগে বুঝি কেউ একজন এসে এই ক্ষেতটা আবাদ করেছিল। আর তাই এখন তাদের খাবারের উৎস। মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করলে লোকে তরমুজ খায়। ঝাল খেতে ইচ্ছে করলে তরমুজের ছোলার তরকারি খায়। আর টক খেতে ইচ্ছে করলে তরমুজের ছোলা দিয়ে আচার বানিয়ে খায়। আবার যদি পানীয় পান করতে ইচ্ছে করে, তরমুজের জুস খায়। এতেই ঐ রাজ্য সুখে আছে। কিন্তু খাদ্যপূর্ণ দেশ তাও সন্তুষ্ট নয়। তারা চায় আরো কিছু। তবে খাদ্যপূর্ণ দেশে সবরকমের খাবারই পাওয়া যায়, শুধুমাত্র ফল পাওয়া যায় না। একদিন খাদ্যপূর্ণ দেশের রাজা তার মন্ত্রীকে বললেন, "এত গরমে আর টেকাই যায় না। কিছু একটা পানীয় পান করতে ইচ্ছে করছে।" তখন মন্ত্রী বলল, "রাজামশাই! পানীয় তো অনেকই আছে। সেভেন-আপ, স্প্রাইট- আরো কত কী! সবই তো আমাদের সিন্দুক থেকে বের হয়।" তখন রাজা বলল, "না, ওসব একঘেয়ে হয়ে গেছে। আর ওসবে ভালোমত পুষ্টিও নেই। আমার চাই তরমুজের জুস। কত বছর তরমুজের জুস খাই না।" মন্ত্রী বলল, "তরমুজের জুস পাব কোথায়? দেখুন মহারাজ, তরমুজের জুস তো আর পাওয়া যাবে না। আপনার যখন পুষ্টিকর পানীয় খেতে ইচ্ছে করছে, তখন পানি খান। পানি তো আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী! পানির কত গুণ! পানি  ছাড়া কোন প্রাণীই বাঁচে না।" (মন্ত্রী আরো বকবক করতে থাকল।) রাজা বকবক শুনতে শুনতে গলা ফাটিয়ে একটা চিৎকার দিয়ে বলল, "চুপ কর তুমি! অসহ্যকর! খেতে চেয়েছি তরমুজের জুস, আর উনি পানির পুষ্টিগুণ শিখাতে আসছে। ঐ বেটা, চাকরি খোয়াতে চাস নাকি? আমি কি তোমার কাছে পানির পুষ্টিগুণ শুনতে চেয়েছি? পারলে তরমুজের জুস এনে খাওয়াও। আর কে বলেছে, তরমুজের জুস নেই? খাদ্যশূন্য দেশেই তো আছে! সেখান থেকে একটু আনলে কী সমস্যা?" তখন মন্ত্রী ঐ দেশে লোক পাঠালো। পাঠিয়ে ঐ রাজার কাছে বলল, "আমাদের মহারাজ তরমুজের জুস খেতে চেয়েছেন। তাই এখান থেকে কয়েকটা তরমুজ নিয়ে যেতে চাই।" রাজা বলল, "কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমি নেই না, প্রশ্নটা বরং আমার প্রজাদের কাছে জিজ্ঞেস কর। তারা রাজি হলে ধরে নেবে, আমি রাজি।" তখন ঐ রাজ্যের লোক রাজ্যের প্রজাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "তোমরা কি আমাদের দেশের রাজার জন্য কয়েকটা তরমুজ দিতে পার?" তখন ঐ দেশের প্রজারা বলল, "অবশ্যই! কিন্তু তার বদলে সামান্য কিছু আপনাদের দেশের খাবার দিলে খুশী হই।" তখন ঐ রাজ্যের লোক বলল, "কেন? কয়েকটা তরমুজও এমনি এমনি দিতে পার না? কেমন আচরণ তোমাদের? ভালোয় ভালোয় কয়েকটা তরমুজ দিয়ে দাও। নইলে আমাদের রাজা কি করে, দেখো।" তখন খাদ্যশূন্য দেশের প্রজারা একটি কন্টেইনারের ভিতর এক গ্লাস তরমুজের জুস বানিয়ে ভরে দিল। বলল, "আপনাদের রাজা শুধু জুস খেতে চেয়েছে, তরমুজ চায়নি। তাই এই জুসটুকু আপনাদের রাজার কাছে দিয়ে দিয়েন।" ঐ রাজ্যের লোক তো ছিল একটু হাবাগোবা। শুধুমাত্র অন্য জিনিস চাওয়ার ক্ষেত্রে কী বলতে হবে, এটা শিখে এসেছিল। বাকি কিচ্ছুই তো শিখে আসেনি। তাই ঐটুকুই নিয়ে রাজার কাছে চলে আসল। রাজা খেয়ে বলল, "অসাধারণ! অনেক সুস্বাদু। মন্ত্রী! আমার তৃষ্ঞা গিয়েছে, কিন্তু খিদে যায়নি। আর খিদে আমি মিষ্টি তরমুজ দিয়ে মিটাবো। জুসই এত মজা, কামড়ে খেতে না জানি কত মজা লাগবে! আর মন্ত্রী তুমি হাবাগোবা লোক ছাড়া আর কাউকে পেলে না? এক কন্টেইনারে হালকা কিছু জুস এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। আজব! মন্ত্রী, এবার তুমি নিজে গিয়ে আমার জন্য তরমুজ আনবে।" তারপর মন্ত্রী গেল ঐ রাজ্যে। গিয়ে বলল, "আমাদের রাজা তরমুজ কামড়ে খেতে চেয়েছে। দাও তো কয়েকটা তরমুজ!" তখন ঐ দেশের লোকেরা বলল, "ঠিক আছে। কিন্তু সামান্য কিছু খাদ্যপূর্ণ দেশের খাবার দিলে খুশী হতাম।" মন্ত্রী একটা ধাবড়ানি দিয়ে বলল, "কিসের এত বিনিময়? উপহার স্বরূপ কিছু দিতে পার না বুঝি? ভালো চাইলে জলদি করে কয়টা তরমুজ দাও।" খাদ্যশূন্য দেশের লোকেরা আর কী বলবে? তিনটা তরমুজ দিয়ে দিল। তারপর রাজা তরমুজ খেয়ে বলল, "অসাধারণের চেয়েও অসাধারণ! আহ, কী মজা! এবার আমার দুপুরের খাবারের সময় হয়েছে। এবার আমি তরমুজের ছোলার তরকারি দিয়েই খেতে চাই। এবার তুমি আর তোমার ঐ হাবাগোবা লোককে নিয়ে যাও। এবারের ছোলা তো ভুলে ফেলে দিয়েছি। আর আমি অত অপেক্ষা করতে পারব না। ওদেরকে গিয়ে বল, কয়েকটা টাটকা তরমুজের ছোলা ধুয়ে-কুটে রান্না করে পাঠাও।" মন্ত্রী ও তার হাবাগোবা লোক রাজার কথা অনুযায়ী কাজ করল। খাদ্যশূন্য দেশের লোকেরা বলল, "আমরা দুপুরে খাওয়ার জন্য এই মাত্র টাটকা টাটকা তরমুজের ছোলা রান্না করলাম। সেখান থেকে পুরোটাই দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু তার বদলে যদি আপনাদের দেশের কিছু ভিন্ন ধরনের ভাত-তরকারি পাঠাতেন, তো ভালো হতো।" মন্ত্রী বলল, "কয়বার বলব, কোন বিনিময় নেই? কথা বাড়িও না! যদি করে মহারাজের জন্য কিছু তরমুজের তরকারি পাঠিয়ে দাও। আগের মত খাদ্যশূন্য দেশ আবারো তরকারি পাঠিয়ে দিল। রাজা খেয়ে বলল, "আজকে তো আমার খাবারগুলো দারুন হচ্ছে! এত ভালো তরকারি আমি আগে কোনদিন খাইনি। একটু পরেই তো বিকাল হয়ে যাবে। তোমরা তো জানই, আমার বিকালে হালকা-পাতলা কিছু চাটনি-আচার খেতে ভালো লাগে। আর আজকে আমি তরমুজের চাটনি-আচারই খেতে চাই। কারণ, এখন তো তরমুজই হয়ে গেছে আমার প্রিয় ফল। তোমরা দু'জন আবার যাও এবং আচার নিয়ে এসো।" আগের মতনই ঐ দেশের লোকেরা প্রথমে কিছু খাবার চাইল, তারপর আবার ঠিকমতোই বিনিময় ছাড়া রাজার জন্য আচার পাঠিয়ে দিল। রাজা চেটে চেটে আচার খেতে লাগল। আর বলল, "অসাধারণ! তরমুজই একটা অসাধারণ ফল। যাই একমাত্র আমাদের সিন্দুকে পাওয়া যায় না। এবার আমি ঘুমোতে গেলাম।" এরপর রাজা মন্ত্রীকে আবার বলল, "ইস! এ তরমুজ যদি রোজ রোজ পাওয়া যেত! মন্ত্রী, তুমি আমাকে প্রত্যেকদিন এরকম তরমুজ এনে দেবে, বুঝতে পেরেছ?" মন্ত্রী বলল, "কিন্তু ওরা তো প্রতিদিন বিনে পয়সায় দেবে না। আর এভাবে আনলে আপনার সম্মান যাবে কোথায়?" রাজা বলল, "খুবই চিন্তার বিষয়। দেখি, কিছু পাই কিনা ভেবে। এই, একটা বুদ্ধি তো মাথায় এসেছে। ওদের কাছে বাগানটাই কিনে নেই! থুক্কু, থুক্কু। কিনে নেই না, ভয় দেখিয়ে দখল করে নেই।" তখন মন্ত্রী বলল, "মহারাজ! আপনি যাই বলুন না কেন, এ কাজ আমি একা করতে পারব না। আমি ভয় দেখাতে পারলেও অতটা পারব না। আর আমার হাবাগোবা লোককে নেয়া আর না নেয়া তো সমান। রাজামশাই, আপনিই চলুন আমার সাথে। আপনার এত ইচ্ছে, নিজের হাতে নিয়ে আসলে আরো ভালো হবে।" রাজা বলল, "ঠিকই বলেছ! চল, এক্ষণি যাই।" এরপর রাজা ও মন্ত্রী দু'জন মিলে গেল খাদ্যশূন্য রাজ্যে। গিয়ে ঐ রাজ্যের প্রজাদের বলল, "তোমাদের বাগান তো আসলে আমাদের দেশের সীমানার মধ্যে পড়ে। আমি খুবই বিনয়ী মানুষ, তাই কিচ্ছু বলি না। আর এর আশপাশ দিয়ে যে তোমরা বাড়ি বানিয়ে থাক, তাও কিচ্ছু বলি না। এখন এ বাগানটা আমি পুরোপুরি আমার হিসেবে নিয়ে নিতে চাই।" খাদ্যশূন্য রাজ্যের প্রজারা এটা শুনে থ হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল না, রাজা এসব কী বলছে! শেষ পর্যন্ত তারা একটুখানি বুদ্ধি করে বলল, "হে আমার বিনয়ী মহারাজ! আপনি তো খুবই বিনয়ী। আপনি দয়া করে এই তরমুজের বাগানটা পুরোপুরি আপনার করে নেবেন না। আর যদি আপনি নেনও, তাও আমাদেরকে প্রতিদিন আপনাদের দেশের কিছুটা খাবার দেবেন।" রাজা তখন একটু রেগে গিয়েছিল। বলল, "ঠিকই বলেছ। আমি খুবই ভালো মানুষ। তাই আমি অসৎ জিনিস নিজের চোখে দেখতে পারি না। তোমাদের এই আবদার খুবই অসৎ আবদার। তাই আমি এ বাগানটি পুরোপুরি আমার করে নিলাম।" এই বলে রাজা ঐ দেশের কেউ কিছু বলার আগেই বাগানটি নিজের নামে করে নিল। তারপর মহা আনন্দে নিজ দেশের প্রাসাদে ফিরল।
কিন্তু আসলে ঐ বাগানটিতে অনেক ঝামেলা। সেই বাগানে চাষ করতে হয় অনেক বিশিষ্ট একটা পদ্ধতিতে। আর সেই পদ্ধতি ঐ খাদ্যশূন্য দেশের মানুষ ছাড়া আর কোন মানুষই জানে না। এদিকে বাগান দখল করে ফেলার পরের দিন থেকে রাজার ঐ সিন্দুকটাও খাদ্য দেয়া বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তখন রাজা ওদিকে কোন খেয়ালই করলো না। সে তার প্রিয় ফল তরমুজ নিয়েই মহাখুশী। কিন্তু ওখানে যতটুকু তরমুজ ছিল, তা শুধু এক সপ্তাহেই খাওয়া যায়। ৬ষ্ঠ দিনে রাজা তরমুজ খেতে একটু অধৈর্য্য হলো। আর মনে মনে বলল, "আজকে সিন্দুকের খাবারই খাব।" কিন্তু সিন্দুক যে খাবার দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে, আর তার রাজ্যও যে খাদ্যশূন্য দেশের খাতা নাম লিখিয়ে বসে আছে, সেদিকে রাজার খেয়ালই ছিল না। এখন রাজা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু রাজা মনে মনে ভাবল, "যাই হোক, তরমুজ দিয়ে তো আরো অনেক দিন চালানো যাবে।" কিন্তু রাজার ধারণা ভুল ছিল। ৭ম দিনে শুধু একটা তরমুজ বেঁচে ছিল। রাজা তাও পাত্তা দেয়নি। কারণ, সে ভেবেছে, আরো তো চাষ করে নেয়াই যাবে। এত ভয় পাওয়ার কী আছে?" এই  বলে রাজা ঐ একটা তরমুজও সাবাড় করে ফেলল। আর রাজ্যের অন্য প্রজাদের কথা কিছু ভাবলও না। কিন্তু তারপর চাষ করতে গিয়ে দেখা গেল, কোনভাবেই ঠিকমত করে চাষ করা যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত রাজাকে মাঠে মারা গিয়ে পস্তাতে হলো। আর ওদিকে খাদ্যশূন্য দেশের প্রজারা অন্য জমির সন্ধান পেল, যেখানে ধান সহ যাবতীয় গাছ ও সবজি ফলানো যায়। এরপর থেকে ধাদ্যশূন্য দেশ হয়ে গেল খাদ্যপূর্ণ দেশ, আর খাদ্যপূর্ণ দেশ হয়ে গেল একেবারেই খাদ্যশূন্য দেশ।

শিক্ষা: অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।

Thursday, April 25, 2019

**** ভালো টিচার ও পচা টিচার ****

এক ছিল এক স্কুল। সে স্কুলে অনেক টিচার ছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল পচা টিচার, আরেকজন ছিল ভাল টিচার। পচা টিচারটি প্রিন্সিপালকে বলে, "আমাকে আপনি যত ক্লাস দেবেন, দেন। কিন্তু বেতন অনেক দেবেন। পুরো স্কুলের ক্লাসও যদি দিতে হয়, তাও আমি নেব। তবে বেতন কিন্তু কম দিলে চলবে না।" আর ভাল টিচারটি প্রিন্সিপালকে বলল, "আপনি আমাকে বেতন আপনার পছন্দমত দেন, কিন্তু ৩টা ক্লাসের বেশি ক্লাস আমাকে দেবেন না। আপনি যদি আমাকে অনেক বেতন দেন, আমি যদি অনেক ক্লাস নেই, তাহলে আপনার লাভ হবে না, বরং আমারই লাভ হবে। আমিই বেশি টাকা পাব। কারণ, বেশি ক্লাস নিতে গেলে বিভিন্ন ক্লাসের তো বিভিন্ন পড়া। এতকিছু মাথার মধ্যে গুলিয়ে যাবে। তাই ৩টা ক্লাস নিলে আমিও ভাল পড়াতে পারব, আপনিও কম বেতন দিয়ে পারবেন। লাভটা তো আপনারই।" এই দুইজন ছিল নতুন টিচার।
পরের দিন দুই টিচারই ক্লাস নিতে গেল। ভাল টিচারকে দেয়া হলো তিনটি ক্লাস। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা ভার্সনের বিজ্ঞানের ক্লাস, আর শিশুশ্রেণির ইংরেজি ভার্সনের অংক ক্লাস। তাকে বেতন দেয়া হলো ৬,০০০/- টাকা। কিন্তু ভালো টিচার কিছু মনে করল না। আর পচা টিচারকে দেয়া হলো ২০টি ক্লাস। তাকে দেয়া হলো ৪০,০০০/- টাকা। পচা টিচারের ভাগে ছিল বড় বড় ক্লাসের ক্লাস, আর বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন দুইটা মিলানো। এবার দুইজন গিয়ে ক্লাসে ঢুকলো।
প্রথমে দেখা যাক ভালো টিচারের কথা। সে আগে শিশুশ্রেণির ক্লাসে গেল। গিয়ে সে সবাইকে চুপ করে বসতে বলল। সবাইকে বই বের করতে বলল। এবং খুব ভালভাবে অংকের নিয়ম শিখিয়ে দিল। প্রত্যেক বাচ্চার কাছে বিশেষভাবে গিয়ে গিয়ে দেখল, তারা পারছে নাকি। না পারলে বুঝিয়ে দিল। তারপর সবাইকে দুটি অংক বাড়ির কাজ দিয়ে দিল। আর বলে দিল, "তোমরা সবাই কি অংকটা বুঝেছ? এ ধরনের অংক যদি বাসায় দুটো করতে দেই, পারবে তো? বাসায় টিচার থাকুক, আর মা-বাবা থাকুক, তাদের কোন সাহায্য নিও না। কিছু না বুঝলে তখন সেটা রেখে দাও। আর পরের দিন আমার কাছে এসে জানতে চেও। মনে কর, আমি তোমাকে এক নিয়ম শিখালাম। যদি মা-বাবা আরেক নিয়ম শেখায়, দুটো নিয়মই তুমি ভুলে যাবে। তাই সবাই যেভাবে বললাম সেভাবে বাড়ির কাজ করে আনবে।" তারপর ভাল টিচার বিদায় নিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্লাসে গেল। সে বইয়ের প্রত্যেকটি লাইন দেখে প্রশ্নোত্তর বানিয়ে দিল। এবং বলে দিল, আজকে বাসায় গিয়ে তোমরা এই সব প্রশ্নোত্তর পড়বে। কালকে আমি পড়া নেব না। কিন্তু তাও আজকে গিয়ে পড়বে। কালকে রিভিসন করবে। তার পরের দিন আমি পড়া নেব। পড়তে গিয়ে কোন সমস্যা হলে কালকে আমাকে জানাবে। দুইদিন সময় পাওয়ার পরেও যদি তোমরা না পড়া দিতে পার, তাহলে একদিনে দুটো পরীক্ষা নিয়ে নেব। আর এ সব কিছুর নম্বর কিন্তু পরীক্ষায় যোগ হবে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে গিয়েও টিচার একই কথা বলল। সে খুব ভালোই পড়ালো।
এবার আসি পচা টিচারের কথায়। সে তার সবচেয়ে ছোট ক্লাস ষষ্ঠ শ্রেণিতে গেল। একজনকে বলল বই নিয়ে আসতে। তাকে সামনে দাঁড় করালো। বলল, "বই দেখে জোরে জোরে রিডিং পড়, যাতে সবাই শুনতে পায়। আর সবাই! তোমরা ওর পড়া শুনে বোঝার চেষ্টা কর। আর ওর পড়ার মধ্যে কোন কথা বলবে না।" তারপর বাচ্চাটার রিডিং পড়া শেষ হয়ে গেলে পচা টিচার তাকে গিয়ে বসতে বলল। সবাইকে বলল, "বুঝেছ তো? এই চাপ্টারের প্রত্যেকটি লাইন থেকে হোম-ওয়ার্ক খাতায় প্রশ্নোত্তর বানাবে। তারপর পড়বে। কালকে আমি পড়া নেব। না পারলে পরীক্ষা থেকে ১০ নম্বর কমিয়ে দেব। আর কোন সমস্যা হলে বাসার টিচার বা মা-বাবার হেল্প নেবে। আমি এতকিছু সামলাতে পারব না।" এই বলে সে ক্লাস থেকে বিদায় নিল। এবার ষষ্ঠ শ্রেণির ইংরেজি ভার্সনে গেল। গিয়ে বলল, "Hey everyone! Take out your book and open at page 62. Read silently. After reading, make question-answer from each line and after finishing your work you can play. Now I am going to take rest, don't disturb me." মিসের এই কথা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই এক কাজ করল। তারা বুঝল, টিচারটা আলসে। সে খাতা চেকও করবে না। তাই তারা ইচ্ছেমতো খেলাধুলা করতে লাগল। আর ঘন্টা পড়ে গেলে টিচার ক্লাস থেকে চলে গেল। ঐ সময় কারোরই কোন পড়া হলো না। এভাবে টিচার প্রতি ক্লাসে গিয়েই উল্টোপাল্টা গোজামিল দিয়ে চালাতে লাগল।
এর পরের দিন ছিল অভিভাবক দিবস। বাচ্চারাও আসল। ছোট ক্লাসের বাচ্চারা যারা ভাল টিচারের ক্লাস পেয়েছে, তাদের অভিভাবকরা প্রিন্সিপালকে গিয়ে বলল, "এই টিচার অনেক ভাল। এই টিচারকে কোনদিন দয়া করে সরাবেন না। বাচ্চারা এই টিচারকে খুব পছন্দ করে।" আর যারা পচা টিচারের ক্লাস পেয়েছে, তারা সবাই তার নামে অভিযোগ করতে লাগল। ঐ বাচ্চাদের মা-বাবারা গিয়ে প্রিন্সিপালকে বলল, "এই ক্লাসের টিচার মোটেও ভাল না। ক্লাসে বাচ্চাদেরকে কিছু বুঝিয়ে দেয় না। একটা বাচ্চা সামনে গিয়ে পড়তে থাকে, আর সবাই তা না শুনে দুষ্টুমি করতে থাকে। টিচার বুঝিয়ে দেবে না? রিডিং পড়া তো সবাই পড়তে পারে। আর এই টিচার সবাইকে বাসায় গিয়ে বাসার টিচার বা মা-বাবার কাছ থেকে সাহায্য নিতে বলে। এই টিচারকে শোকজ করুন, নয়তো এই ক্লাসে দেবেন না। এই টিচার থাকলে কেউ ভাল রেজাল্ট করতে পারবে না।" এরপর প্রিন্সিপাল ঐ টিচারকে শোকজ করলেন। আর ভাল টিচারকে গিয়ে বললেন, "তুমি অনেক ভাল পড়াও। তোমার বেতন আমি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছি। তোমার বেতন আমি ২০,০০০/- করে দিচ্ছি। পচা টিচারের ভাগে অন্য যেসব ক্লাস ছিল, সেগুলো তুমি নাও। তাহলে তোমার বেতন ৫০,০০০/- করে দেব।" তারপর ভাল টিচার বলল, "না, না! আপনি যদি বেতনের লোভ দিয়ে আমাকেও বেশি ক্লাস দেন, আমিও তো পচা টিচারের মত হয়ে যাব। আপনি কি চান আমাকেও পচা টিচারের মত করতে? তাই দেখে দেখে আমার মত আরো টিচার নিয়োগ দিন। তাদেরকে অল্প অল্প করে ক্লাস দিন, বেতন একটু কমিয়ে দিন। তাহলে আপনার অনেক লাভ হবে। টাকাও কম দেবেন, আর লেখাপড়াও ভাল পাবেন।" তারপর প্রিন্সিপাল তাই করলেন। আর ঐ স্কুলটি এখন আরো ভালো হয়ে গেল।

Saturday, April 13, 2019

*** সারা ও আনাস ***

এক ছিল এক পরিবার। পরিবারে ছিল মা, বাবা, বড় বোন এবং ছোট ভাই। বড় বোনের নাম সারা। আর ছোট ভাইয়ের নাম আনাস। সারা পড়ালেখায় খুব ভালো ছিল, কিন্তু তার ব্যবহার ভালো ছিল না। আর ছোট ভাইয়ের পুরো উল্টো। সে একেক ক্লাসে দুই বছরের কমে পাস করতে পারত না। আর গুরুত্বপূর্ণ কঠিন ক্লাসগুলোতে তো তিনবারও লেগে যেত পাস করে উঠতে। তবে ছোট ভাইয়ের ব্যবহার ছিল খুব ভালো। সারা ছিল অহংকারী, হিংসুটে আর খারাপ। আনাস ছিল বিনয়ী, সরল ও ভালো। সারা প্রতি বছর ফার্স্ট হয়। সারা এ বছর ৭ম শ্রেণিতে পড়ে। আনাসের ৫ম শ্রেণিতে পড়ার কথা হলেও সে এখন প্রথম শ্রেণি পাস করতে পারেনি। মা-বাবা ব্যস্ত মানুষ। বাচ্চাদের ঠিকমতো পড়াতে পারে না। টিচার দিয়ে রাখে। কিন্তু আনাস টিচারের কাছে পড়লেও সে খারাপ রেজাল্ট করে। আর সারা খুব ভালো রেজাল্ট করে। মা-বাবা সারাকে খুব পছন্দ করে। সারা যা চায়, তা ৯০% ই মা-বাবা কিনে দেয়। কিন্তু আনাস কিছু চাইলে তার ১০%ও মা-বাবা পূরণ করে না। তবে মা-বাবা যে তাকে ঘরে রেখেছে, এই তো বেশি। কিন্তু সারার নামে অনেক অভিযোগ। সে অন্য বাচ্চাদেরকে জ্বালায়। তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। তাও টিচাররা বলে, যতই দুষ্টুমি করুক, ভালো রেজাল্ট তো করে! তাই ওকে মাফ করে দেয়া যাবে। তবে আনাসের নামে কোন অভিযোগ নেই। তা সত্ত্বেও মা-বাবা সারাকেই বেশি ভালোবাসে। আনাস ক্লাস ওয়ানে এক বছর পড়েই পাস করতে পেরেছিল। মা-বাবা তো খুশি আর ধরে রাখতে পারে না। তার জন্য আনাসকে তার মা-বাবা একটা খেলনা জাহাজ কিনে দিয়েছিল। এই নিয়ে সারার যত হিংসা। একদিন যখন মা-বাবা অন্য কোথাও গেল, তখন সারা আনাসের কাছে গেল। গিয়ে বলল, "তুই নিজেকে কী মনে করিস, বল তো? তুই শুধুমাত্র পাস করেছিস। এটা নিয়ে এত গর্ববোধ করিস কেন? আর মা-বাবার আক্কেলটা কি? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারি না। তোর মত ফেল্টুস মারা ছেলেকে নিয়ে তারা এত মাতামাতি করে কেন? কত সুন্দর একটা খেলনা জাহাজ কিনে দিয়েছে, দেখ! শুধুমাত্র এক বছরে এক চান্সে পাস করেছে বলে? এটা তো কত মানুষেই করে। তুই আসলে একটা আস্ত গাধা। তাই তো বারবার ফেল করিস। আর অহংকারীও বটে। মনে করিস, আমি কত ভালো রেজাল্ট করেছি। তাই মা-বাবা আমাকে সুন্দর খেলনা কিনে দিয়েছে। খেলনাটা আসলে আমার পাওনা ছিল। এক্ষনি খেলনাটা আমাকে দিয়ে দে। দে বলছি! নইলে তোকে কিন্তু মেরে তক্তা বানিয়ে দেব।" এই কথা শুনে আনাস বলল, "এসব কী বলছ তুমি, আপু? তুমি তো ঠিকই বলেছ। আমার মত ছেলের তো এটা পাওয়ার কথা না। তোমার যদি নিতে ইচ্ছা করে, তুমি নিয়ে নাও। তোমারই যখন পাওনা, তুমিই তো নেবে।" তখন সারা আরো রেগে গিয়ে বলল, "এই, তোর মুখে এত বড় বড় কথা কেন? আমাকে দয়া দেখাচ্ছিস? নাকি রাগ করে খেলনাটা দিয়ে দিচ্ছিস? আমি ফকির না, বুঝেছিস? আর আমাকে একটু সম্মান করে চলিস। কারণ, আমি তোর চেয়ে হাজার গুণ যোগ্য। আর এখন ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেয়ার মত করে আমাকে খেলনা দিবি না। দেমাগী ছেলে কোথাকার!" এরপর আনাস বলল, "আপু, তোমার কোন কথাই আমি বুঝি না। তুমি কি জাহাজটা চাও, নাকি চাও না? যাই বলি, তাতেই কেন দোষ?" তারপর সারা বলল, "আমার কথা যদি তুই বুঝতি, তাহলে পাসই তো করতি। এখন আবার মুখে মুখে তর্ক করা হচ্ছে! আচ্ছা যাই হোক, এত করে যখন সাধছিস, তখন নিয়েই নিলাম। দে।"- এই বলে সারা খেলনা জাহাজটা নিয়ে নিল। এবং খেলতে থাকল। আনাস মনে মনে বলল, "আপুটা কেন যে এমন করে, বুঝি না। দিলেও দোষ, না দিলেও দোষ। প্রথমে তো আমি কিছু বলিনি। আমি তো কিছু চাইও নি। মা-বাবা নিজেরাই আমাকে এসে এটা দিয়ে গেছে। আমার দোষটা কোথায়? আর শেষমেষ নিয়েও গেল। তাও আবার এতগুলো কথা শুনিয়ে। ভালোই লাগে না আর।" এরপর সারা ঘরে গিয়ে জাহাজ নিয়ে খেলছিল। হঠাৎ মা-বাবা এসে দেখল, সারার হাতে আনাসের খেলনা। মা-বাবা সারাকে জিজ্ঞেস করল, "কিরে, এটা না আনাসের খেলনা জাহাজ? তুই এটা পেলি কোথা থেকে?" তখন সারা বলল, "মা-বাবা, জান! আনাস না আমাকে সেধে সেধে এই খেলনাটা দিয়েছে। সে বলেছে, আপু! একটা কথা শুনবে? তোমাকে না আমি এই খেলনাটা দিয়ে দেব। তুমি কত ভালো রেজাল্ট কর! আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত। এটাই তোমার জন্য।"- এই বলে আনাস আমাকে এই খেলনাটা দিয়ে দিয়েছে। আমি কত থাক থাক করলাম, কিচ্ছুই শুনল না।" তারপর মা-বাবা বলল, "আচ্ছা, তুই খেল। আমরা আসছি।" এই বলে তারা আনাসের ঘরে গেল। গিয়ে দেখল, আনাস মুখ গোমরা করে বসে আছে। তখন মা-বাবা বলল, "কি রে? তোর খেলনা কোথায়?" তখন আনাস বলল, "আপু ওটা আমার কাছ থেকে নিয়ে গেছে। আপুর খেলতে ইচ্ছা করেছিল, তাই আপু আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে গেছে। তবে আমি তো আর মানা করতে পারব না, সেজন্য আপুকে দিয়ে দিয়েছি।" আনাস এ কথাগুলো বললেও আজেবাজে কথাগুলোর কথা কিছুই উল্লেখ করল না। তারপর দুপুরে তারা যখন খেতে বসল, তখন বাবা তাড়াতাড়ি খেয়ে বাইরে গেল। বাকিদের খাওয়া শেষ না হতেই বাবা হাতে একটা চকলেট নিয়ে আসল। আনাসকে দিয়ে বলল, "বাবা! তোর খেলনাটা তো সারাকে দিয়েছিস। এই ৫ টাকা দামের চকলেটটাই তোর জন্য। এমনিতে বেশি ভালো রেজাল্ট হয়নি। তাও অন্য রেজাল্টের তুলনায় ভালো হয়েছে বলে এটা দিলাম। তুই খেয়ে নিস।" এটা দেখে সারার তো রাগে গা গজগজ করছে। সে বলল, "মা! বাবা! আনাস তো শুধুমাত্র পাস করেছে। আমি তো ফার্স্ট হয়েছি। আমাকে দিলে না?" মা-বাবা বলল, "আমাদের কাপড়-চোপড় রাখার যত বড় ড্রাজ, তোর ঘরে তার থেকেও বড় ড্রাজ কেন তাহলে? আর আমাদের ড্রাজের সমানই আরেকটি ড্রাজ রয়েছে, যেগুলোতে তুই জামা-কাপড় রাখিস। তাহলে বড় ড্রাজটাতে তুই কি রাখিস, বলতো? প্রতি বছর তো ্হাজারটা গিফট পাস। সেগুলো রাখার জন্য তোর পুরো একটা ্ড্রাজ দরকার হয়, তাও আবার জামাকাপড়ের ড্রাজের চেয়ে বড়। আনাস তো আমাদের কাছ থেকে জীবনে নিজের কাজের জন্য একটা গিফট পায়নি। সবই মা-বাবার কর্তব্যের জিনিস পেয়েছে। আর তুই, তোর তো ড্রাজ প্রায় বলতে গেলে পুরোই ভরে গেছে। তুই সব সময় যা চাস, তাই পাস। দামী হাতঘড়ি চেয়েছিস, কিনে দিয়েছি। এমন দামী জামাকাপড় কিনে দিয়েছি, যেমন দামী জামাকাপড় আমাদের কারোই নেই। তুই যেমন ধরনের ডিজাইন করা কলম-পেন্সিল চেয়েছিস, সবসময় তাই দিয়েছি। যেমন ধরনের মেকাপ-গয়না চেয়েছিস, সব দিয়েছি। এমনকি ৭ম শ্রেণিতে থাকতে দুইটা গেম খেলার ট্যাব, যা তুই খালামনিদের থেকে গিফট পেয়েছিস, আর আমি আবার তোকে স্মার্টফোন আর ল্যাপটপ কিনে দিয়েছি। তোর এত কিছু থাকা সত্ত্বেও তুই যখন এগুলো ব্যবহার করিস না, তখন আনাসকে এক ফোঁটাও দেখতে দিস না। তুই যে ধরনের খাবার চাস, সে ধরনেরই দেই। যদি সেগুলো খেলে তোর অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলেই শুধুমাত্র তা দেইনি। অর্থাৎ, তোর ভালোর জন্য যা যা দরকার, সব দিয়েছি। যেমন ধরনের খেলনা চেয়েছিস, তাও দিয়েছি। আর কত কি চাস তুই? এগুলো তো কেবল গিফটগুলোর ২০% বলেছি। আরো কত গিফট যে তোর কাছে পড়ে আছে, তার কোন হিসাবও নেই। তোর সারা ঘর গিফট দিয়ে ভর্তি। তাও তুই আনাসের থেকে খেলনা চেয়ে নিস কি করে? তোর কি লজ্জা-শরম বলতে কিচ্ছু নেই? ওকে দিয়েছি দিয়েছি, তাতে তোর কি সমস্যা? তোর কাছে কি আমাদের কৈফিয়ত দিতে হবে? তুই যখন চাস, তখন টাকা দেয়া হয় তোকে। তুই ১ হাজারের মধ্যে ১ জন। তোর মত সুখী অনেক কমই আছে। তাও তুই এমন করিস? তোর লজ্জা করা উচিত। এখন আনাসকে ৫ টাকা দামের একটা চকলেট দিয়েছি বলে তোর এত হিংসা! কেন? তোকে না ইয়া বড় বক্সে অনেক দামী বিদেশী চকলেট দিয়েছি! তাহলে এখন ৫ টাকা দামের একটা চকলেট নিয়ে এত হিংসা করার কি দরকার? আর তুই খুব অহংকারীও। নিজে খুব ভালো রেজাল্ট করিস। তাই চাস অন্য কেউ যাতে তোর চেয়ে ভালো না করুক। তোকে অনেক বার একটা জিনিস করতে বলেছি। একটা জিনিসই তোর কাছ থেকে চেয়েছি। সেটা হলো, তুই আনাসকে একটু পড়া। তুই নিজে ভালো পড়তে পারিস, কি করে পড়িস নিয়মটা একটু আনাসকে শেখা। তা তো তুই জীবনেও করিসনি। সবসময় আনাসকে insult করেছিস। ও তো তোরই ভাই। ও যদি insulted হয়, তার মানে তুইও insulted হলি। এ সব কথা শোনার পরেও কি তোর লজ্জা করে না?" এবার সে অনুতপ্ত হয়ে কান্না জুড়ে দিল। সে খেলনাটি আনাসের কাছে দিল। সে তার গিফট থেকে আরো অনেক গিফট আনাসকে দিল। আনাসকে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দিও, ভাইয়া! আমি তোর সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। আর করব না। তোকে এখন থেকে প্রত্যেকদিন পড়াবো। দিনের পড়া দিনে পড়িয়ে দেব। আমি পড়ার জন্য যেসব কৌশল ব্যবহার করি, সব তোকে বলে দেব। যদি তুই অন্যদের না বলিস।" তখন আনাস বলল, "তুমি দেখছি শুধরেও শুধরালে না। ভাইয়ের প্রতি হিংসা দূর হলেও অন্য মানুষের প্রতি হিংসাটা এখনো রয়েই গেছে। যেই শুনেছিস যে, আমাকে insult করা হলে তোকেও insulted করা হবে, তাই নিজের আত্মসম্মানের জন্যই তুই আমাকে পড়াতে চাইছিস। আত্মকেন্দ্রিকতার ভাবটা এখনো ঠিকই আছে।" তারপর সারা বলল, "তাই তো! ঠিক আছে, তোর যাদের ইচ্ছা তাদেরকে বলতে পারিস।" এরপর থেকে আনাসও ভালো রেজাল্ট করতে শুরু করল। আর সারারও ব্যবহার একটু ভালো হলো। এরপর সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।

Friday, March 29, 2019

মিষ্টিনগরী ও ঝালপুর

এক ছিল এক দেশ। দেশের দুটি অংশ। একটি অংশে মানুষ মিষ্টি খেতে পছন্দ করে, আরেকটি অংশে মানুষ ঝাল খেতে পছন্দ করে। আর দেশটি দুই ভাগে ভাগ হয়েছে মূলত এই খাদ্যাভ্যাসজনিত বিভক্তির কারণে। যে অংশের মানুষ মিষ্টি খেতে পছন্দ করে, ঐ অংশের নাম দেয়া হয়েছে মিষ্টিনগরী। আর যে অংশের মানুষ ঝাল খেতে পছন্দ করে,  সে অংশের নাম দেয়া হয়েছে ঝালপুর।
মিষ্টিনগরীর মানুষ সকালে মাখন-চিনি দিয়ে পাউরুটি খায়, দুপুরে আর রাতে দুধ-ভাত খায়। আর জুস খেতে হলে দশ চামচ চিনি দিয়ে জুস খায়। অপরদিকে ঝালপুরের মানুষ সকাল বেলা পাউরুটির উপর মরিচভর্তা মাখিয়ে তার উপর দিয়ে মরিচের গুঁড়ো ছিটিয়ে খায়। আর দুপুরে লাল টকটকা (ঝাল) মুরগীর মাংস দিয়ে ভাত খায়। আর রাতে বোম্বাই মরিচ দিয়ে বেগুনভর্তা খায়। আর জুস খেতে ইচ্ছা করলে পানির সাথে গ্রীনচিলি সস মিশিয়ে তাতে হলুদের গুঁড়া দিয়ে খায়। অনেক বছর ধরে এই নিয়ম চলছে। কিন্তু এখন আবার মিষ্টিনগরীর মানুষ বলে, "ইস! আমাদের ভাগের মানুষের এত ডায়রিয়া কেন হয়? তাছাড়া কৃমির উপদ্রব কেন এত বেশি হয়? তাছাড়া মিষ্টি খেতে খেতে মাঝেমধ্যে বমি বমি লাগে। ওদিকে ঝালপুরের মানুষরা বলে, "আমাদের জিহবায় কেন ঘা হয় এত? পেটেই বা কেন এত আলসারের ছড়াছড়ি? তাছাড়া ঝাল খেতে খেতে ছোট বাচ্চারাও সব পানি শেষ করে ফেলছে।" ঝালপুরের মানুষ ভাবে, মিষ্টিনগরের মানুষ বোধহয় সুখে মিষ্টি খেয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে। তাই তারা হার মানতে না চেয়ে কষ্ট সহ্য করছে। আর মিষ্টিনগরের মানুষেরও একই অবস্থা।
হঠাৎ মিষ্টিনগরের দুইটি ছেলে ও ঝালপুরের দুইটি মেয়ে খেলতে খেলতে দুই অঞ্চলের সীমানায় এসে পড়ল। তাদের দেখা হলো। পরে একজন ছেলে সাহস করে খাবারের কথাটা মেয়ে দুটিকে বলল। তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, "তোমাদের কি এত ঝাল খেতে খেতে অসহ্য লাগে না?" এবার মেয়ে দুটো বলল, "কী! তোমাদেরও এই অবস্থা নাকি? বড়দেরকে খবর দিতে হচ্ছে।" এবার ছোট বাচ্চারা গিয়েই বড়দেরকে সব খবর দিয়ে দিল। এবার ঠিক করা হলো, মিষ্টিনগরের খাবার একটা বড় বাটিতে করে প্রত্যেক বাড়ির মানুষ সীমানায় রেখে আসবে। এরপর ঝালপুরের মানুষ সেইসব বাটির খাবার নিয়ে ঝালপুরের খাবার ঐ বাটিতে করে আবার সীমানায় রেখে দেবে। এভাবে চলতে থাকবে। আর এক বছর পরপর এই নিয়ম চালু হবে। প্রথম বছরে এই নিয়ম হবে। তার পরের বছরে যে যা খাচ্ছিল সে তাই খাবে। তার পরের বছর আবার এই নিয়ম চলবে। এভাবে চলতে থাকবে। তাহলে সবার সবকিছু খাওয়া হবে। রোগের সংখ্যাও কমে যাবে। এই নিয়ম অনেকদিন চলল। কিন্তু দেশকে দুইভাগ না করে একভাগ করে দিলেই তো হয়! সবাই সবকিছু খেতে পারে। এই বুদ্ধিটি আসল ৫ বছরের একটা বাচ্চা মেয়ের কাছ থেকে। সে বড়দেরকে এই উপায়টা বলল। বড়রা কেউ তাকে পাত্তা দিল না। কিন্তু তার বড় ভাই তাকে সাপোর্ট করল। এরপর আরো কিছু ছেলেমেয়ে এসে একজোট হলো। এবং সব বড়দের কাছে গিয়ে এই উপায়টা প্রচার করল। তারপর থেকে এরকম সাধারণ নিয়ম আবার চালু হলো। যার যেটা খুশি সে সেটা খাবে। সবাই আনন্দে থাকবে।

Sunday, March 17, 2019

***ধনী-গরীবের স্কুল***

এক ছিল একটি দেশ। সেই দেশের রাজা ছিল চিন্তাশীল। সে সবকিছু ভেবেচিন্তে এবং কোনটা ভালো হবে সেটা ভেবেই সব কাজ করত। সে দেখল, গরীব বাচ্চারা ঠিকমত লেখাপড়া করতে পারছে না। এজন্য সে একটি বিদ্যালয় খুলল। সেই বিদ্যালয়ের নিয়মগুলো সে একটা কাগজে লিখল। লিখে বলল, "এ কাগজটির লেখা জিনিসগুলো যেন জোরে মাইকিং করে বলা হয় সারা দেশে।" নিয়মগুলো হলো, "জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন বই দিবস হবে, যেমনটা সব সময় হয়। আর সেই দিন গরীব-ধনী সবাইকেই বই দেওয়া হবে। গরীবদের পড়ানো হবে বিনে পয়সায়। আর যদি সাধ্য থাকে, তাহলে যতটুকু দেয়া যায় ততটুকু দিতে হবে। আর ধনীদের মাসে দেড় হাজার টাকা বেতন। প্রথম দিন বই দেয়ার সাথে সাথে গরীব এবং ধনীদের সাথে মেলামেশা করিয়ে দেয়া হবে। বই দিবসের সাথে সেদিন পরিচয় দিবসও হবে। ২ তারিখ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত গরীবদের বর্ণ, বর্ণমালা, কার চিহ্ন, সংখ্যা ইত্যাদি মৌলিক জিনিস শেখানো হবে। এবং ভালো করে শিখিয়ে দেয়ার পর অনেক অনেক বাড়ির কাজ দেয়া হবে। যার জন্য সময় দেয়া হবে ৬ মাস। এরপর পুরো জুলাই মাস তাদেরকে আরেকটু বড় লেভেলের জিনিস পড়ানো হবে এবং ডিসেম্বর মাসে তাদের পরীক্ষার কিছু টিপস দেয়া হবে। এরপর ডিসেম্বর মাসে তাদের পরীক্ষা হবে। ধনীদের নভেম্বর মাসেই পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবে। আর বাকি সব মাসে ধনীদের পড়া হবে।"
এই ঘোষণা প্রচারের পর উক্ত স্কুলে ভর্তির জন্য হাজার হাজার আবেদন পড়ল। এরপর রাজামশাই ঠিক করল, আগে গরীবদের Admission হবে। ধনীদেরটা পরে দেখা হবে। তাও গরীবের সংখ্যা হাজারের নিচে নামল না। এখন রাজা বলল, "এই বছর শুধু ৫ থেকে ৭ বছরের বাচ্চাদের ভর্তি করানো হবে।" কিন্তু এই কথা বলার পরেও হাজারের নিচে সংখ্যা নামল না। এরপর রাজা ঠিক করল, আমার রাজ্যে তো এত গরীব থাকার কথা নয়। গরীবের সংখ্যাই সব মিলিয়ে ৫০০ থেকে ৭০০। কিন্তু ৫ থেকে ৭ বছরের বাচ্চাই যদি ১ হাজারের উপরে হয়, তাহলে কি করে হবে? এবার রাজা কে আসল গরীব সেটা যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিল। সে বলল, আগামীকাল বিকেল ৪টায় এই স্কুল প্রাঙ্গনেই কাঙ্গালী ভোজ হবে। ভোজের পর ভর্তির সাক্ষাতকার হবে। কিন্তু রাজার মাথার আসল বুদ্ধিটা প্রকাশ করল না। এরপর সব মানুষ স্কুল প্রাঙ্গনে ভিড় করল। সবাই বসে পড়ল। এরপর শুরু হলো কাঙ্গালী ভোজ। কাঙ্গালী ভোজে দেয়া হলো ৬ দিনের বাসি পুঁইশাকের চরচরি। ধনীর দুলাল-দুলালীরা খাবার মুখে তুলতে না তুলতেই নাক চেপে ওয়াক দিতে দিতে দৌড়ে চলে গেল। তারা একেকজন মন্তব্য করতে লাগল, "এত জঘন্য পচা খাবার বাপজনমেও দেখিনি।" আর ভোজস্থলে পড়ে থাকল মাত্র ১০৯ জন। তারা বলল, "শোকর আলহামদুল্লাহ! এত মজার খাবার গত এক মাসেও খাইনি। আল্লাহ রাজা মশাইয়ের হায়াত দারাজ করুন। রাজা মশাই খুবই চিন্তাশীল। আমাদের পেটের ক্ষুধার খবরও তিনি রাখেন।" এরপর রাজা ঘোষণা দিলেন, "এরাই আমার স্কুলের দরিদ্র কোটার Original Candidate। এটাই ছিল আসলে পরীক্ষা। আমি পেয়ে গেছি আমার আসল গরীব ছাত্রদের। আর যারা ভুয়া দরিদ্র প্রার্থী ছিল, তারা ধনী কোটায়ও ভর্তির সুযোগ পাবে না। আর যদিও বা করতেই হয়, তাহলে তারা মাসে ১০ হাজার করে টাকা দেবে। আর তার থেকে যাতে গরীবদেরও পড়ার খরচটা উসুল হয়।" বাকি যারা ধনী কোটায় ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে কেউ আছে যে, ভুয়া গরীব সেজে আবেদন করার চিন্তা করেছিল, কিন্তু বাস্তবে সেরকম করেনি। তারা খুশীমনে বলতে লাগল, "ভাগ্যিস! আমরা ২ নম্বরীর পথে যাইনি। তাহলে আমাদের ভর্তিটাও মাটি হয়ে যেত।"

Thursday, March 7, 2019

এলিয়েনের পুতুল

এক ছিল একটি দেশ। সেই দেশে অনেক কম মানুষ থাকত। কিন্তু ঐ দেশে অনেক অদ্ভূত অদ্ভূত জিনিস হতো। ঐ দেশটি এলিয়েনদের খুব পছন্দ ছিল। তাই এলিয়েনরা ঐ দেশের মানুষদের অদ্ভূত সব উপহার দিয়ে যেত। সেই দেশে একটি বিরাট জায়গা ছিল যেখানে কেউ যায় না। সেখানটা সবাই এলিয়েনদের জন্য রেখে দিয়েছে। তারা এলিয়েনদের দেয়া উপহার পছন্দ করে। একদিন এলিয়েনরা একটা অদ্ভূত পুতুল উপহার দিয়ে যায়। সেই পুতুলের সাথে একটা কাগজ ছিল। পুতুলটা কিন্তু জামার দোকানে যেরকম ডল সাজিয়ে রাখা হয় তেমন। কাগজটিতে লেখা ছিল, "এই পুতুল একটি বিশেষ পুতুল। এই পুতুলটি প্রত্যেকের কাছে এক মাসের জন্য যাবে। যদি কেউ এই নিয়ম ভঙ্গ করে, এই পুতুলটি উধাও হয়ে যাবে, আর জীবনেও এলিয়েনরা কিচ্ছু দেবে না। এই পুতুলটিকে তিন বেলা খাবার দিতে হবে। এই পুতুলটিকে নিয়ে একটি খেলা খেলতে হয়। তার জন্য একটা আলমারি দরকার। পুতুলটির পায়ের সাথে স্পেসশিপের ছবিওয়ালা একটা স্টিকার লাগানো আছে। ঐ স্টিকারটা আলমারির সাথে লাগাতে হবে। পুুতুলটিকে একা একটি ঘরের ভিতর রাখতে হবে। তারপর প্রতিদিন তিন বেলা তাকে খাবার দিতে হবে। পুতুলটি খাবার খেয়েও ফেলবে। তার জন্য একেক দিন একেক জিনিস আলমারির ভিতর উপহার দিয়ে যাবে এই পুতুলটি। এতক্ষণ শুধু ভালো জিনিস আলোচনা করা হয়েছে। এবার আসা যাক অসুবিধাতে। পুতুলটি যখন রুমের ভিতর খাবার খাবে, কেউ যদি উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা পর্যন্তও করে, তাহলেও সেইদিনই তার হার্ট এটাক হবে। আর প্রত্যেকটি মানুষকেই এই পুতুল এক মাসের জন্য রাখতে হবে। খেতে দিতে হবে ও উপহার নিতে হবে। আবার এক মাসের বেশিও নেয়া যাবে না। সে ফকীরই হোক, আর আমীরই হোক। প্রথমে বলেছি, শুধু আর কোন উপহার পাওয়া যাবে না এই নিয়ম ভঙ্গ করলে। কিন্তু এটাই বলা হয়নি যে, কেউ ঐ নিয়ম ভঙ্গ করলে তার জন্ডিস, ক্যান্সার এরকম রোগ হবে। আর একটা কথা, এই কাগজ যে পাবে, তার জন্য একটা কাজ আছে। তাহলো, এখানকার লেখা সবকিছুই বড় বড় করে বড় কাগজে লিখে দেয়ালে টানাতে হবে। যে এই কাগজ প্রথম পাবে, তাকেই সবাইকে বোঝাতে হবে সব কিছু। সে কিন্তু ফকীরও হতে পারে। আর যদি সে নিয়ম ভঙ্গ করে, তার জীবনে নানা অসুবিধা আসতে থাকবে। আর এসব নিয়ম কারো কাছে উদ্ভট মনে হলে সে মন চাইলে বিদেশেও চলে যেতে পারে।"
আনিকা নামের একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে যে কেবল পড়া শিখেছে ও এলিয়েনদের বিষয়ে আগ্রহী, সে প্রথম এ কাগজ ও ডলটিকে দেখতে পেল। সে দৌড়ে ডলটির কাছে গেল। সে প্রত্যেকদিন ঐ জায়গার কাছে আসত এবং দেখত, এলিয়েনরা কিছু দিয়েছে কিনা। আজ সে পেয়েছে। সে কাগজটি নিয়েই পড়তে শুরু করলো। শেষে গিয়ে সে ভাবল, আমাকেই দেখছি এখন সব করতে হবে। কিন্তু আমার বাসায় তো অনেক মার্কার, কাগজ, ভালো ভালো জিনিস আছে। আমি তো পারি বড় বড় করে লিখে টানাতে। তাহলে করে ফেলি কাজটা। যদি এটি ভুয়া হয়, তাহলে আমি পড়াশুনাই কিন্তু ছেড়ে দেব।- এই ভেবে সে বড় বড় করে কথাগুলো লিখে দেয়ালে টানিয়ে দিল। তারপর সবাই ঐ লেখা পড়ল। সর্বপ্রথম আনিকাই ঐ ডলটি নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল। সে সব ঠিকঠাক করল। শুধু মা-বাবার কাছে একটা শর্ত দিয়ে যে, সে পড়ালেখায় অনেক ভালো করবে। প্রথমদিন আনিকা তার সকালের নাস্তা থেকে অর্ধেক পুতুলের জন্যই জমিয়ে রাখল। কারণ, মা-বাবা তো আর এজন্য কষ্ট করে বেশি ভাত রান্না করবে না। তারপর সে খাবারের থালাটি পুতুলটির সামনে রেখে সব দরজা-জানালা পর্দাসহ ঠিকমতো বন্ধ করে রাখলো। সে ভেবেছিল, হয়তো তার পরিশ্রম জলে যাবে। কিন্তু তা হলো না। আনিকা দুপুরবেলা দরজা খুলে এসে দেখল, থালা খালি হয়ে গেছে। পুতুলটির রুমে একটি চক ছিল। চক দিয়ে দেয়ালের কোনায় লেখা ছিল, "পানি।" আনিকা  বুঝল, "পুতুলটি পানি চাইছে।" আনিকা পানি ও দুপুরের খাবার পুতুলের কাছে দিয়ে বাইরে চলে গেল। রাত্রেও এরকম করে পুতুলকে খাবার দিল। এবং রাত্রেবেলা ঘুমানোর আগে সে আলমারি খুলে দেখল, আলমারির ভিতর একটা গয়নার বাক্স। তার মধ্যে সুন্দর সুন্দর গয়না। ৫০ ভাগ গয়না সোনার, আর ১% গয়না হিরের, এবং বাকি ৪৯ ভাগ গয়না রূপোর। আনিকার খুব পছন্দ হলো জিনিসগুলো। কিন্তু সে মাকে দেখালো না। সে উপহারগুলো আলমারিতে জমিয়ে রাখল। এরকম করে খাবার দিতে দিতে সব খাবার খাওয়ানো হয়ে গেল। মাসও শেষ হয়ে গেল। তার সাথে আলমারিও উপহার দিয়ে ভরে গেল। এরপর তার মনে ভয় জেগে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি একজনকে বলল, "তুমি তাড়াতাড়ি একটা আলমারি যোগাড় কর। দয়া করে এই মাসটা তুমি পুতুলকে নিয়ে রাখ।" যাকে আনিকা একথা বলেছে, সে রাজি হয়ে গেল। এভাবে পুতুলটি একেকজনের বাড়িতে যেতে লাগল এবং সবাই প্রায় বড়লোক হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত কয়েক বছর কেটে যাওয়ার পর একজনও বাকি রইল না, যে পুতুলটি নিজের কাছে একমাস রাখেনি। এরপর পুতুলটি একদিন অদৃশ্য হয়ে গেল। এবং আকাশ থেকে কিছু কাগজ উড়ে উড়ে পড়তে লাগলো। সেই কাগজে লেখা, "তোমরা খুব ভালোভাবে পুতুলটি ব্যবহার করেছ। খুব খুশি হয়েছি। তোমাদের পুরস্কার- প্রত্যেকদিন বিকেল ৪ টার সময় ঐ খালি জায়গায় সোনা-রূপোর গয়নার বৃষ্টি হবে। তোমরা বড়লোক হয়ে যাবে। ধন্যবাদ।" এরপর থেকে প্রত্যেকদিন সোনা-রূপার বৃষ্টি হতে লাগলো এবং সবাই সুখে-শান্তিতে বাস করতে লাগলো। [পানির বৃষ্টি বন্ধ হয়নি।]

Sunday, February 17, 2019

যমজ পরিবার

এক শহরে থাকত এক মহিলা। তার ছিল দুই যমজ মেয়ে। একজনের নাম রজনী ও আরেকজনের নাম রঞ্জনা ছিল। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে রজনী ও রঞ্জনা দুইজনেরই বিয়ের পর একই দিনে দুইজনেরই দুইটি যমজ মেয়ে হয়। রজনী ছিল খুব মিশুক। সে মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু সে তার বন্ধুদেরকে কোন না কোন কিছু দিয়ে বন্ধুত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু সে গরীব কারো সাথে বন্ধুত্ব সহজে করত না। এককথায় বলতে গেলে সে কিছুটা স্বার্থপর ছিল। আর রঞ্জনা ছিল বেশ ঝগড়ুটে। সবার সাথে সারাদিন ঝগড়া করে কাটিয়ে দিত। তবে তার একটা কারণ আছে। সে একটা চাকরি করে। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত। সে সকাল বেলা গেলেই তার বস তার সাথে রাগী কণ্ঠে কেন যেন কথা বলে। এমনিতেই তার সাথে কেন যেন রাগ দেখায়। আর একদিন লেট হলে তো কান আর ঠিক থাকবে না। কথা শুনতে শুনতে হয়তো কানটাই ঝালাপালা হয়ে যাবে। আর সবচেয়ে দু:খজনক বিষয়, একদিন থাকে weekend, আর সেইদিনই তার বস তাকে বাসায় ডাকে। এবং বাসায় ডেকে extra কাজ করায়। আর এক্সট্রা কাজ করার সময়ও হুটহাট ঝগড়া করে। তার বসের উপর তো রঞ্জনা রাগ ঝাড়তে পারে না। সে কারণে তার সমান বা ছোট পদের মানুষদের উপর সে রাগ ঝাড়ে। রজনীর দুটি মেয়ের নাম আনিলা ও অন্বেষা। রঞ্জনার দুটি মেয়ের নাম সায়মা ও সামিয়া। তবে মায়ের থেকে মেয়েগুলো একেবারে উল্টো হয়েছে। রজনীর মেয়েগুলো খুব ঝগড়ুটে। তবে তারা এমনিতেই ঝগড়ুটে। রঞ্জনার মেয়েগুলো ছিল মিশুক। একদিন আনিলা, অন্বেষা, সায়মা এবং সামিয়া সবাই স্কুলে গেল। আনিলা আর অন্বেষা যখন বেঞ্চে বসতে যাবে, তখন তারা ব্যাগ বেঞ্চে না রেখেই খেলতে চলে গেল। তারা ব্যাগ কাঁধে নিয়েই খেলতে লাগল। খেলায় এতই মজে গিয়েছিল তারা। তারা কিন্তু অনেক আগে স্কুলে এসেছে। সবার আগে। তারা ফাস্ট বেঞ্চে হাত রেখেছিল। মানে তারা ঐ বেঞ্চেই বসবে। কিন্তু যদি তারা ব্যাগ দিয়ে জায়গাটা দখল না করে, তাহলে অন্য কেউ তো বসতেই পারে। অন্য দিকে সামিয়া আর সায়মা দু'জন মিলে তাড়াতাড়ি করে তাদের ব্যাগ ফার্স্ট বেঞ্চে রেখে দিল। আনিলা, অন্বেষা, সামিয়া এবং সায়মা সবাই অনেকক্ষণ ধরে খেলতে লাগল। এর মধ্যে অন্যান্য অনেক বাচ্চারা আসল। তারা সবাই সেকেন্ড বেঞ্চ, থার্ড বেঞ্চ করতে করতে দশম বেঞ্চ পার করে ফেলল। এগারো নম্বর বেঞ্চে একটা ফেল্টুস মারা ছেলে বসেছে। তার পাশে কেউ বসে না। একেবারে পিছনে আছে বারো নম্বর বেঞ্চ। সেটি সবচেয়ে পিছনের বেঞ্চ। সেই বেঞ্চে বাধ্যতামূলক না হলে কক্ষণো কেউ বসে না। একটু পর আনিলা অন্বেষা এবং সায়মা সামিয়ারা ক্লাসে ঢুকলো। সায়মা এবং সামিয়া তো নিজেদের ব্যাগের পাশে বসেছে। আর তক্ষনি শিক্ষিকা ক্লাসে ঢুকলো। আনিলা এবং অন্বেষা দাঁড়িয়ে রইলো। তারা গিয়ে শিক্ষিকার কাছে সায়মা ও সামিয়ার নামে নালিশ করলো। তারা বলল, "ম্যাম! দেখুন, আমরা এখানে আগে এসেছি। সবার আগে ক্লাসে ঢুকেছি। এখন আমরা ফার্স্ট বেঞ্চে বসেছিলাম। তারপর আমরা খেলতে যাই। কিন্তু সায়মা এবং সামিয়া ফার্স্ট বেঞ্চে বসে যায় আমাদের না বসতে দিয়ে। এখন ১১ নং বেঞ্চ পর্যন্ত বসা হয়ে গেছে। ১২ নং বেঞ্চে আমরা কেন বসব? যখন আমরা সবার আগে আসি, তখন কেন ১২ নং বেঞ্চে বসতে হবে?" কিন্তু তারা ব্যাগের কথা কিছুই উল্লেখ করল না। যার কারণে টিচারও তাদের দলে গেল। টিচার বলল, "এই সায়মা এবং সামিয়া! তোমরা কিন্তু বড় অন্যায় করেছ। ওরা আগে এসেছে, তোমরা কেন ফার্স্ট বেঞ্চে বসতে চাচ্ছ?" সায়মা এবং সামিয়া ম্যামকে বলল, "ম্যাম! শুনুন। ওরা ক্লাসে ব্যাগ নিয়ে এসেছিল। ওদের কি করার কথা? ব্যাগটা ফার্স্ট বেঞ্চে রেখে খেলতে যাবে না? ওরা ব্যাগ কাঁধে নিয়েই খেলতে গেছে। তাই আমরা আমাদের ব্যাগটা ফার্স্ট বেঞ্চে রেখে ফার্স্ট বেঞ্চ দখল করেছি। এখন ওদেরকে তো ১২ নং বেঞ্চেই বসতে হবে। যদি আপনি বলেন, ওরা হয়তো বা ব্যাগ এনে রেখেছিল, আমরা সরিয়েছি, তাহলে এটা পুরো মিথ্যে। তার প্রমাণ হলো ওদের কাঁধেই এখনো ব্যাগ আছে। এবার আপনিই বিচার করুন।" ম্যাম বলল, "দুই দলের কথাই আমি শুনেছি। কিন্তু বিচারের জন্য আমার একজন নিরপেক্ষ সাক্ষী চাই।" সে তার ক্যাপ্টেনকে দাঁড় করালো। ক্যাপ্টেন বলল, "ম্যাডাম! সায়মা এবং সামিয়ারাই ঠিক কথা বলেছে।" ম্যাম আরো কিছু স্টুডেন্টকে জিজ্ঞেস করল। সবাই বলল, "সায়মা এবং সামিয়ারাই ঠিক বলছে।" আগেই বলা হয়েছিল, সামিয়া এবং সায়মারা মিশুক। ওরা মানুষের সাথে মিশতে ভালোবাসে। তারা প্রায় পুরো ক্লাসের সাথেই বন্ধুত্ব করেছিল। কিন্তু ক্যাপ্টেনের সাথে ভালোভাবে বন্ধুত্ব করতে পারেনি। ক্যাপ্টেন এমনিতেই সত্যি বলেছে। আর অন্যরা বুঝুক বা না বুঝুক, তাদের বন্ধু সায়মা এবং সামিয়াদের কথাই বলেছে।  

Monday, January 28, 2019

রূপালী ও তার ভাইয়েরা

এক ছিল এক পরিবার। সেই পরিবারে ছিল মা, বাবা, বড় দুই যমজ ভাই এবং ছোট এক বোন। তারা কিন্তু ছোট ছিল না। মা-বাবা একটু বৃদ্ধ ছিল। মানে ৪০/৫০ বছর। ছেলেগুলোর ১৮ বছর। এবং মেয়েটির ১৫ বছর। বড় ভাইগুলো অলস ছিল। ছোট মেয়েটি কাজ করতে পছন্দ করত। বড় দুই ভাইয়ের নাম ছিল জসিম এবং করিম। মেয়েটির নাম ছিল রূপালী। তাদের মা-বাবার একদিন কোন কারণ নিয়ে অনেক ঝগড়া হলো। ঝগড়া দিনে দিনে বাড়তেই থাকল। শেষে মা বলল, "থাকব না আর এই সংসারে। তুমি থাক তোমার বাচ্চাদের নিয়ে। আমি বাপের বাড়ি গিয়ে মা-বাবার সাথে সময় কাটাবো।" এই বলে মা সত্যি সত্যি তার বাড়ি চলে গেল। আর আসছে না। শেষে বাবাও বুঝে নিল, ও আর আসবে না। এবার আদালতে বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করা হলো, "তোমরা কার সাথে থাকবে?" বড় দুই ভাই বাপের দলে ছিল। তাই তারা বাপের সাথেই থাকবে। মেয়েটি দু'জনকেই একেবারে সমান পছন্দ করতো। কিন্তু সে দেখল, তার বাবা ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, উল্টোপাল্টা করে। মা তো সব ঠিকভাবেই করতে পারে। আর তার বড় দুই ভাই উল্টোপাল্টাও না, একেবারে কিছুই করতে পারে না। তাই সে বাবা এবং তার ভাইদের পরিবারেই গেল। এভাবে দু'জন আলাদা হয়ে গেল। বড় হয়ে তাদের বাবা মারা গেল। এখন বড় ভাইগুলো তো কোন কাজই করতে চায় না। ছোট বোন রূপালী একদিন জসিম ও করিমকে বলল, "এই! তোমরা এমন কেন? টাকাও তো আয় করতে পার কোনভাবে। এত অলস কেন তোমরা? পড়ালেখা ভালোমতো কর না কেন? পড়ালেখা না করলে আমাকে সাহায্য করার জন্য মেয়েদের মত বাড়ির কাজও তো শিখতে পারতে। কি করবে? বাড়িতে কাজ করবে, নাকি পড়ালেখা করে চাকরি করবে? যেকোন একটা করতেই হবে।" জসিম বলল, "এই, আমরা তোর বড় না? এমন করে কথা বলছিস কেন? আচ্ছা, যা। আমি ও করিম চাকরি করতে পারব না। আমি শুনেছি, চাকরি করা খুব কঠিন। ভাত একটু দেরিতে খাওয়া হলে তেমন কিছু হবে না। কিন্তু অফিসের কাজ করতে একটু দেরি হলে অনেক কিছু হতে পারে। তাই আমি আর করিম বাড়িতেই বাড়ির কাজ করব।" রূপালী বলল, "এ আবার কেমন কথা? উল্টা হয়ে গেল না? উপার্জন তাহলে আমি করব? ঠিক আছে! তোমরা যখন চেয়েছ, তাই হবে। এমনিতেও পড়াশোনা আমার ভালো লাগে। তাই আমি চাকুরি করব। কিন্তু তোমরা যদি ঠিকমতো খাবার না দিয়েছ না, খবর আছে! এমনিতে কিন্তু এই দায়িত্ব নিয়েছ। যাই হোক, এই কথাই রইল।" করিম বলল, "ঠিক আছে! কোন সমস্যা না, তুই চাকরি করিস। আমরা তোর খাবার রেডি করে দেব। এরপর থেকে রূপালী পড়াশোনায় সব বোর্ডের পরীক্ষায় বৃত্তি পেতে লাগল। কিন্তু সে যে বৃত্তি পেয়েছে, সেটা সে কাউকে জানালো না। বরং এক জায়গায় লুকিয়ে রাখল। এরপর সে খুব ভালো রেজাল্ট করল। এবার চাকরির পালা। রূপালী সব সার্টিফিকেট দেখিয়ে অনেক বেতনের চাকরি পেল। কিন্তু তার নিয়ম হলো সাড়ে সাতটার ভিতরে অফিসে গিয়ে গোছগাছ করে বসে থাকতে হবে। টানেমানে হলেও অনুপস্থিতি ধরা হবে। এবং অনুপস্থিতি মানে একদিনের বেতন কাটা যাবে। তার বাড়ি থেকে অফিসে আসতে ২০ মিনিট সময় লাগে। তার মানে ৭:০০ টার আগেই বাড়ি থেকে বের হতে হবে। ঠিকঠাক মতো গোছগাছ করতে পারার জন্য ১০ থেকে ১৫ মিনিট তো লাগবেই। আবার দুপুর বেলা বাড়ি আসতে হবে। এসে ঐ জিনিসপত্রগুলো রেখে অন্য জিনিস নিয়ে আসতে হবে। কি মনে হচ্ছে? সব জিনিস একবারে এনে হোটেলে খেলেই তো হয়। কিন্তু জিনিসগুলোর পরিমাণ এত বেশি, এক ধরনের জিনিস নিতেই হাত ব্যথা হয়ে যায়। আবার বিকাল বেলা বাড়ি আসতে হবে। এসে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত ফ্রি। কিন্তু আবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় অফিসে অতিরিক্ত সময় অর্থাৎ ওভারটাইম করার ব্যবস্থা আছে। তবে সেটা করলেই ভালো। সে তার ভাইদেরকে গিয়ে পুরোটা খুলে বলল। এবং বলল, "সাড়ে ছয়টার মধ্যে খাবার যেন রেডি হয়। নইলে চাকরির দায়িত্ব কিন্তু তোমাদের দেব।" ভাইয়েরা বলল, "ঠিক আছে।" এই বলে তারা একটা বুদ্ধি বের করল। যাতে তাদের আর অত সকালে উঠতে না হয়। তারা সন্ধ্যা বেলায় আরামে-বিরামে ভাত রান্না করল। তাও আবার একজনের। কারণ, তারা বাসি ভাত খেতে চায় না। তারা ঐ ভাত পাশের বাড়ির ভালো ফ্রিজে রেখে আসল। এবং ঠিক করল, পরের দিন সকালে ঐ খাবার তারা টেবিলের উপর বোনের জন্য রেখে দেবে, আর সকাল দশটার সময় নিজেরা টাটকা ভাত রান্না করে খাবে। বোন যখন একটু পরেই উঠবে, তখন ভাই দুটো গিয়ে ভাতটা নিয়ে এসে টেবিলের উপর রাখল। এবং ঘুমিয়ে পড়ল। বোন সকাল বেলা উঠলো। এবং ভাইদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, "কিরে, খাবার কি তৈরি করেছিস? নাকি এমনি এমনি ঘুমোচ্ছিস?" করিম বলল, "বড় ভাইকে কেউ তুই বলে? তুই এমন করিস কেন? যা, দেখ, তোর খাবার টেবিলের উপর রাখা আছে।" এই বলে করিম আবার ঘুমিয়ে পড়লো। রূপালী ভাতটুকু মুখে দিল। এবং মনে মনে বলল, "ছি! খাবারটা এমন লাগছে কেন? টাটকা ভাত তো এমন লাগে না! আরো সুস্বাদু হওয়ার কথা। দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা! আমি তো আজকে শুধু প্রাকটিসের জন্য অফিসের কথা বলেছি। আসলে অফিস তো আগামী কালকে থেকে। দেখাই মজা।" এই বলে বোনটি ভালোমতোন ভাত রান্না করল। এবং নিজে ভালো ভাতটা খেয়ে নিল। এবং বাসি ভাত ভাইদের জন্য রেখে দিল। সে একটা কাগজের ভিতর লিখল, "জসিম এবং করিম ভাইকে রূপালী। এই ভাতটুকু তোমাদের জন্য উপহার। সময় বেঁচে গিয়েছিল তো, তাই।" এই লিখে সে কাগজটা প্লেটের পাশে রেখে অফিসের ব্যাগ আলমারির ভেতর ঢুকিয়ে রাখল। এবং গল্প করার জন্য তার বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গেল। এবার জসিম ও করিমের শিক্ষা হবার পালা। তারা বোনের উপহার দেখে দারুন খুশি হলো। কিন্তু তারা দেখল, গরম ভাতের মত ধোঁয়া উড়ছে না। তাও তারা খেয়ে দেখবে বলে ঠিক করল। তাই তারা একটা লোকমা মুখে দিল। এবং বলল, "থু! এ আবার কেমন খাবার?" রান্নাঘরে শুধু একদিনের খাবারই রাখা ছিল। তাদের অফিসে আবার প্রথম দিন ওয়েলকাম ফি দেয়া হতো। মানে এমনি এমনি স্বাগতম জানানোর জন্য টাকা। বোন ভাবল, এই টাকা দিয়ে কয়েকদিন খাওয়া যাবে। তাই রান্নাঘরে অল্প খাবার ছিল। সবটুকুই রান্না শেষ। বোন ভালোটুকু রেঁধে খেয়ে চলে গেছে। আর বাসি ভাতটুকু তারা আগেই রেঁধেছে। এবার তাদের বাসি ভাত খাওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ই নেই। তারা আরেকটু বাসি ভাত খেল। এরপর ঠিক করল, তারা আর খাবেই না। এভাবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। তারা না খেয়ে আছে। তারা ভাবল, এর চেয়ে সকালে সবার জন্য টাটকা ভাত রাঁধলেই ভালো হতো। বিকেল বেলাই বোন চলে আসল। ভাইয়েরা বলল, "কিরে? তুই আমাদের জন্য ভুয়া উপহার রেখে গেছিস? এ আবার কেমন কথা? তোকে কিন্তু মেরে ভর্তা করে দেব। আমাদের সাথে মশকরা হচ্ছে, না?" মেয়েটি বলল, "তোমরা কেন আমার জন্য বাসি ভাত রেখে গিয়েছিলে? আমি আমার বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম আসলে। তোমাদেরকে শিক্ষা দেবার জন্য। আমি আমার বান্ধবীকে কিছু টাকা ধার দিয়েছিলাম। সে আজ ফেরত দিয়েছে টাকা। তা দিয়ে চাল কিনে এনেছি। শিক্ষা হয়েছে তোমাদের? কথা দাও, আর কোনদিন এমন স্বার্থপরের মত কাজ করবে না। নইলে আমি কিন্তু যেই চাল এনেছি, তা থেকে তোমাদের দেব না।" এই কথা শুনে ভাইয়েরা কথা দিল। এবং বোনও তার চাকরি ভালোভাবে চালিয়ে যেতে লাগল। এখানে গল্প শেষ।

Thursday, January 10, 2019

** গোলাপীর মায়ের স্বপ্ন **

এক ছিল দুইজনের একটি গরীব পরিবার। মা ও মেয়ে। তারা খুব বেশি গরীব ছিল না। কিন্তু এই জীবনও ৮০% মানুষের কাছেই খারাপ লাগে। মেয়েটির নাম ছিল গোলাপী। গোলাপীর মা একদিন স্বপ্নে দেখল, একটা পরীর ডানা ছিঁড়ে গেছে। আর সে ছিল অন্য রকম এক জগতে। আর সেখানে গোলাপীর মাও আছে। পরীটি বলছিল, "বাঁচাও, আমি তো ডানা ছাড়া ভালো করে দাঁড়াতেই পারি না। ডানার উপর ভর করেই আমি দাঁড়াই। আর উড়তে তো পারবই না।" তখন গোলাপীর মা কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, "আমি সাহায্য করতে পারি। কিন্তু কিভাবে আমি তোমাকে সাহায্য করব?" পরী বলল, "আমার তো মনে হচ্ছে তুমি পৃথিবী থেকেই এসেছ। ঘুমের মাধ্যমেই পৃথিবীর মানুষেরা এই দেশে আসতে পারে। শুধুমাত্র পৃথিবীর সুপার গ্লু দিয়েই আমার ডানা লাগানো যাবে। তুমি কি আবার ঘুম ভেঙ্গে তোমার দেশে গিয়ে একটা সুপার গ্লু কিনতে পারবে? যদি তুমি সেটা তোমার পাশে রেখে দুইদিন ঘুমাও, যেকোন একদিন তুমি আবার আমার কাছে আসতে পারবে। তখন আমাকে সুপার গ্লু টা দিও। তাহলে তোমাকেও আমি পুরষ্কার দেব।" গোলাপীর মা "ঠিক আছে" বলে তার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। সকাল বেলা সে ঘুম থেকে উঠল। তার স্বপ্নের কথা মনেই আছে। সুপার গ্লু না কিনলে যেন তার অন্য কাজে মনই বসছে না। তার কাছে যা টাকা ছিল, তা দিয়ে সে ছোট এক বোতল সুপার গ্লু কিনতে পারল। এবং সে অন্য কাজে মন দিতে পারল। এবার সে যখন সেইদিন রাতে ঘুমালো, সেদিন সে কিছুই দেখতে পেল না। পরের দিন রাতে যখন সে ঘুমালো, সে আবার ঐ পরীর সাথে দেখা করতে পারল। সেই পরী বললো, "তোমার হাতেই তো সুপার গ্লু। আমাকে দাও, আমি আমার ডানায় লাগিয়ে আবার ঠিক হয়ে যেতে পারব। কালকে আমি আসতে পারিনি। আজ আমি এসেছি। এবার আমাকে সুপার গ্লুটা দাও।" গোলাপীর মা পরীকে সুপারগ্লুটা দিল। পরী সুপারগ্লু দিয়ে ডানা লাগাতেই পরীকে আরো বেশি ঝলমলে দেখাতে লাগলো। কারণ, সে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। সে গোলাপীর মাকে বলল, "তোমাকে আমি পাঁচটা অপশন দেব। সেখান থেকে যেকোন একটা বেছে নেবে। এবং সেটাই হবে তোমার পুরস্কার। কিন্তু অনেকেই কিন্তু এটা ওটা প্রশ্ন করবে। তুমি যেটাই বেছে নাও না কেন, তোমার মেয়ে ছাড়া আর কাউকেই তুমি আমি যে এটা দিয়েছি সেটা বলতে পারবে না। যদি বল, তাহলে কিন্তু আমি উপহার ফিরিয়ে নেবো। আর তোমার মেয়েও যেন কাউকে কিছু না বলে। প্রথমটা হলো, তোমরা জমিদারের মত ধনী হবে, কিন্তু কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে এটা ওটা বলে সামলে নিতে হবে। দ্বিতীয়টা হলো, তোমাদের ঘর যেমন আছে তেমই থাকবে, কিন্তু তোমাদের ঘরের পাশে যেই বাগান আছে সেই বাগানে অনেক স্বর্ণমুদ্রা তুমি পাবে। এক কোটির মত স্বর্ণমুদ্রা পাবে, কিন্তু সবগুলো থাকবে মাটির নিচে। নিজে খুঁড়ে খুঁড়ে সেই মুদ্রা বের করতে হবে, কারো সাহায্য নেয়া যাবে না, এমনকি তোমার মেয়েরও না। তৃতীয় হলো, তোমরা যেমন আছ তেমনই থাকবে, কিন্তু সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে টেবিলের উপর অনেক খাবার ও সেই দিনের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা পাবে। কিন্তু এটার একটা শর্ত আছে যে, দিনের টাকা দিনেই খরচ করতে হবে। আর যদি কিছু বেঁচে যায়, সৎভাবে তুমি প্রয়োজনের বেশি টাকা খরচ না কর, তাহলে তা টেবিলের উপর রেখে দেবে। সেটা উধাও হয়ে গিয়ে পরের দিনেরটা আবার আসবে। তিন নম্বর অপশনটির কিন্তু একটু এদিক ওদিক হলেই হারিয়ে ফেলবে তুমি তোমার পুরস্কার। চতুর্থটি হলো, তুমি যে কাজ করতে চাও, তা হাত দিয়ে ইশারা করলেই হয়ে যাবে। কিন্তু কাজই শুধু করে দেয়া হবে। আর এই ক্ষমতা তুমি চুরি-ডাকাতি বা কোন অন্যায় কাজে ব্যবহার করতে পারবে না। আর কাজ করার জিনিস কিন্তু থাকতে হবে। শুধু বললেই হবে না যে, আমার বাড়িটা সোনার করে দাও, যত সোনা প্রয়োজন তত সোনা থাকতে হবে। এতে শুধু তোমার পরিশ্রমটা বাঁচবে। আর পঞ্চমটা হলো, তুমি এবং তোমার মেয়ের কখনো কোন অসুখ-বিসুখ হবে না। কিন্তু যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, কেন অসুখ হয় না, তাহলে যদি তুমি আমার কথা বল, তাহলে এই সময়টাতে যত রোগ-ব্যাধি হওয়ার কথা ছিল, সব একবারে হওয়া শুরু হবে। অতএব, সাবধান। এবার তুমি বল, তুমি কোনটা নেবে? যেটা নেবে, ভেবেচিন্তে নিও।" গোলাপীর মা বলল, "আমি তো চিন্তায় পড়ে গেলাম। প্রথমটা নিলে জমিদার হব, কিন্তু কেউ প্রশ্ন করলে তার উত্তর বানাবো কি করে? দ্বিতীয়টা নিলে পরিশ্রম করতে করতে অসুস্থই হয়ে যাব। তৃতীয়টা নিলে আমার মতে ভালো হবে। চতুর্থটা নিলে জিনিসপত্র যোগাড় করা কঠিন হবে। পঞ্চমটা নিলে যদি কেউ মুখ ফসকে কিছু বলে ফেলি, তো সর্বনাশ! আমি তৃতীয়টাই নেব।"
একটু পর গোলাপীর মায়ের ঘুম ভাঙলো। গোলাপীকে সে কানে কানে সব বললো। গোলাপী বলল, "ধূত্তুরি! স্বপ্ন সত্যি হবে নাকি? কিযে বলো!" গোলাপীর মা বলল, "তাহলে সুপার গ্লুটা গেল কোথায়?" এরপর গোলাপী কিছুটা বিশ্বাস করল। আর তারা দু'জন রাত্রেবেলা ঘুমাতে গেল। সকাল বেলা উঠে দেখল, টেবিলের উপর রেডিমেড খাবার এবং কিছু টাকা রাখা আছে। তাও আবার ২০ স্বর্ণমুদ্রা। তারা ১০ স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে যত ভালো জিনিস পারল, কিনল আর আনন্দ করল। কিন্তু যা বেঁচে গেল, গোলাপী লুকিয়ে লুকিয়ে তা নিজের কাছে রেখে দিল। সে ভাবল, হয়তো মা নিজেই কোনভাবে এসব জিনিস টেবিলে রেখে দিয়েছে, আর আমাকে বোকা বানাচ্ছে। এবার দেখি, মা কি বলে। পরী তো খুব রেগে গেল। সেদিন রাতে গোলাপীর মা স্বপ্নে দেখল, সেই পরী আবার এসেছে। সে বলল, "আমি দু:খিত। তুমি তোমার জিনিস সামলে রাখতে পারনি। তাই আমি উপহার ফিরিয়ে নিচ্ছি। তুমি তোমার মেয়েকে জিজ্ঞেস কর, কেন? বিদায়।" এই বলে পরী চলে গেল এবং স্বপ্নও শেষ হয়ে গেল। গোলাপীর মা উঠে দেখল, টেবিল খালি। এবং গোলাপী মুচকি মুচকি হাসছে। সে তো ভীষণ রেগে গেল। মেয়েকে বলল, "এই! সত্যি করে বল, তুই কি করেছিস? আর বাকি ১০টি মুদ্রা কোথায় গেল? এক্ষুণি বল।" গোলাপী বলল, "কী যে বল না মা, আমি কি করে জানব?" এই বলে গোলাপী ভুলে মুচকি হেসে ফেলল। মা তো ভীষণ রেগে গেল। রেগে গিয়ে বলল, "সত্যি করে বল্, নাহলে জীবনেও তোকে আর কোন কিছু জানাবো না। তুই কিছু চাইলেও কিছু দেব না। বল্ তাড়াতাড়ি!" গোলাপী মায়ের চোখ রাঙানো মুখ দেখে সত্যিটা বলে দিল। গোলাপীর মা তো গোলাপীর গালে ঠাস করে একটা চড় মারলো। আর তাকে অনেক বকাবকি করল। এবং রাগ হয়ে তার সাথে সেদিন আর কথাই বলল না। রাতে যখন গোলাপীর মা ঘুমোলো, সে বারবার চেষ্টা করছিল পরীর সাথে আলাপ করতে। শেষমেষ সে দেখা পেল পরীর। সে পরীকে বলল, "আমি খুবই দু:খিত। আমার এই মেয়ের দুষ্টুমি বুদ্ধির কারণেই আজ এতবড় ক্ষতি হলো। যাই হোক, আমি তো একটু বাড়িয়ে বলতে গেলে তোমার প্রাণই বাঁচিয়ে দিয়েছি। নাহলে তো তুমি আধামরা হয়েই পড়ে থাকতে। আমাকে কি আরেকটা সুযোগ দেয়া যাবে?" পরী বলল, "ঠিক আছে। এবার তুমি তৃতীয় অপশন বাদে বাকিগুলো থেকে যেকোন একটা বেছে নাও। এবং তোমার মেয়েকে আরো বেশি সাবধান হতে বল। আর তুমি নিজেও সাবধান থেকো।" গোলাপীর মা বলল, "এবার বরং আমি দ্বিতীয়টাই বেছে নেই। যাই হোক, পরিশ্রমের অভ্যাস তো তাহলে থাকবে। খারাপ কি? আমি এটাই বেছে নিলাম। আর পরী! তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।" সকাল বেলা উঠে গোলাপীর মা সোজা বাগানে গেল। এবং মাটি খুঁড়তে শুরু করল। তিন সেকেন্ডেই সে একটা মুদ্রা পেল। এবং সেটা সে একটা ঝুড়ির মধ্যে রাখল। খুঁড়তে খুঁড়তে ১০০টা সে খুঁড়ল। এবং খুঁড়ে ঝুড়িটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মোহরগুলো রেখে আসল। সে আবার এসে ২০০টা পেল। এভাবে ৩০০ টা পেল। এবার সে এত হাঁপিয়ে গিয়েছে, সে ভুলে তার মেয়েকে ডেকে নিয়ে এসে বলল, "তুইও একটু খুঁড়ে দে না, মা! হাতটা ব্যথা হয়ে গেছে। একটু খুঁড়ে দাও।" মেয়েটা রাজি হয়ে খুঁড়তে থাকল। কিন্তু মেয়েটা যত খুঁড়ল, আর পেল না। সে রেগে গিয়ে কুড়ালটা হাত থেকে মাটিতে ফেলে দিল। সে মাকে বলল, "তুমি এমন কর কেন? পাগলামির মত কর! আমাকে আবার বোকা বানানো হচ্ছে! একেকদিন একেক গল্প শোনাও! রাখ তো।" এই বলে মেয়ে ঘরে চলে গেল। মায়ের এত ক্লান্তি লাগছিল, সে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখল, পরী এসে বলছে, "দু:খিত। তুমি আবার ভুল করেছ। এবং এবার তোমার নিজের ভুল। অতএব, আর তোমাকে সুযোগ দেয়া যাবে না। তুমি এত বড় ভুল কি করে করলে? ঠিক আছে, এবার তুমি তোমার শাস্তি ভোগ কর।" এই বলে পরী চলে গেল।
গোলাপীর মায়ের যখন ঘুম ভাঙলো, তখন সে নিজেকে দোষী ভাবতে লাগল। এবং আবার পরীর দেখা পেতে চাইল। এই আশায় সে আবার ঘুমালো, কিন্তু পরীর দেখা পেল না। সে রাত্রেবেলা যখন ঘুমালো, তখন সে ঝাপসা ঝাপসা পরীর মুখ দেখতে পেল। এবং পরী তার দিকে রাগের চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। গোলাপীর মা বলল, "দয়া কর। আমাকে আরেকটা সুযোগ দাও। আর সুযোগ চাইব না। বাকি তিনটা থেকে কি আমি আর বেছে নিতে পারি? বল না!" পরী রাগ হয়ে বলল, "তোমার আচরণগুলো কিন্তু আমার অসহ্য লাগছে। স্বপ্নে যে তুমি আমার সাথে দেখা করতে পেরেছ এবং স্বপ্নের উপহার বাস্তবে পাচ্ছ, এটা তো কত বড় সৌভাগ্য! আর তুমি প্রথম সুযোগ হাতছাড়া করে দ্বিতীয় সুযোগও হাতছাড়া করলে? আমি জানি, এরপর তুমি যেটাই বাছবে, সেটাও হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। অতএব, আমি নিজেই তোমার জন্য একটা বেছে দিচ্ছি। তুমি জমিদার হওয়ারটাই বেছে নাও। আর তুমি গোলাপীকেও আসল কথাটা জানিও না। তুমি তাকে বলো, এবার তুমি স্বপ্নে দেখেছ যে, তুমি অনেক বড়লোক হয়েছো, কারণ, তোমার মেয়ে জীবনে অনেক ভালো কাজ করেছে। কী সুন্দর, কত সত্য কথা বলেছে! অনেক কিছু করেছে। তুমি আবার ব্যঙ্গ করার স্বরে এসব বলো না। নাহলে আরেকটু চাপা মারার চেষ্টা করো। তোমার মেয়ে যা আমি তো জানতাম না। এবার না বুঝেছি, তোমার মেয়ে কেমন। ঠিক আছে? আসি। এবার স্বপ্নে আমাকে ডাকলেও আমি আর সাড়া দেব না। কিন্তু যদি তুমি শুধু ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য ডাক, তাহলে আমি শুধু এসে দেখা করে চলে যাব, আর জীবনেও আসব না। কারণ, তোমাদের আচরণ আমার ভালো লাগেনি।" এবার মা পরীর কথা অনুযায়ী সব কাজ করল। এবার মেয়েও যদি কাউকে কিছু বলে দেয়, তাহলেও পরী আর এই উপহার ফিরিয়ে নেবে না। কারণ, সে তো মিথ্যা কথাই মানুষকে বলবে। এরপর থেকে তারা জমিদারের জীবন কাটিয়েই সুখে-শান্তিতে বাস করতে লাগল। তবে এটা কিন্তু কাল্পনিক।

Wednesday, December 12, 2018

এক লোক ও কুমির

একদিন এক লোক নদীতে গোসল করছিল। হঠাৎ এক কুমির তাকে ধাওয়া করলো। সে বুঝতে পারছিল না যে, কী করবে। এরপর সে তার সামনে একটি লম্বা দড়ি দেখতে পেল। সে প্রায় নদীর তীরে পৌঁছে গিয়েছিল। সে ভালো ঘাট থেকে নেমেছিল। কিন্তু এখন কাছাকাছি কাদা মাখানো ঘাট ছাড়া কিছুই নেই। তাই সে সহজে উঠতে পারছিল না। নদীর তীরে এক মূর্তি বিক্রেতা বসে ছিল। সে খুব স্বার্থপর ছিল বলে সে নিজের প্রাণ হাতে নিয়ে কিছুতেই লোকটিকে কুমির থেকে বাঁচালো না। লোকটি সামনে থাকা দড়িটি মূর্তি বিক্রেতার সবচেয়ে বড় মূর্তির দিকে ছুঁড়ে মারল। ফলে ঐ মূর্তিটি এসে কুমিরের উপরে পড়ল। কুমিরটির উঠে যেতে অনেক সময় লাগবে। ততক্ষণে লোকটি উঠে যাবে। কিন্তু একা সেই কাজ করা কঠিন। সে মূর্তি বিক্রেতাকে সাহায্য করতে অনুরোধ করলো। কিন্তু ভয়ে মূর্তি বিক্রেতা সাহায্য করলো না। ভাগ্য ভালো সেখান দিয়ে এক ভালো মানুষ যাচ্ছিলেন। ভালো মানুষটি দৌড়ে গিয়ে সাহায্য করলেন। শেষে লোকটি উঠে আসলো। তারপর থেকে সবাই ঐ ভালো মানুষটিকে হিরো বলতো। আর ঐ মূর্তি বিক্রেতা আফসোস করতে লাগল যে, তখন যদি লোকটিকে বাঁচানোর জন্য যেতাম, তো হিরো হতে পারতাম! এখন আমার মূর্তিও নেই। মূর্তি যদি ফেরত চাই তো তারা বলবে, "তুমি লোকটিকে বাঁচাওনি, অথচ তুমি সবার আগে দেখেছ। দ্বিতীয় বার কিছুটা সুরক্ষিত হওয়ার পরেও তুমি সাহায্য করনি। এখন আবার মূর্তি চাও, ছি!"

Thursday, November 1, 2018

কাঠুরের ছেলে ও সাধুবাবা

এক ছিল এক কাঠুরে। তার ছিল এক ছেলে। কাঠুরে রোজ রোজ ভালোমতনই কাঠ পেত। তার ছেলেকে সে অনেকবার বলেছে কাঠ কাটা শিখতে, কিন্তু তার ছেলে কাঠ কাটতে কিছুতেই চায় না। একদিন ছেলেটি বাইরে খেলছিল। হঠাৎ বৃষ্টি নামল। তার বন্ধুদের বাড়ি মাঠ থেকে খুবই কাছে ছিল। তাই তার বন্ধুরা দৌড়ে বাড়ি চলে গেল। কিন্তু ঐ ছেলেটি দৌড় দিতে না দিতেই তার দেখা হলো এক সাধুবাবার সাথে। সে বলল, "এই! আমাকে তোমার বাড়িতে এই বৃষ্টি না যাওয়া পর্যন্ত কিছুক্ষণ আশ্রয় দিলে আমি তোমায় কিছু উপকারী উপদেশ দেব।" ছেলেটি সাধুবাবাকে ঘরে নিয়ে গেল। আর সাধুবাবা বলল, "শোন! আমি যেই কথাগুলো বলব, সেগুলো খুব উপকারী। সেগুলো মেনে চললে একদিন তুমি সুখী হবে। শোন তবে। তুমি বাবার সাথে কাঠ কাটা শেখ। নইলে তুমি পরে বিপদে পড়বে।" একটু পর বৃষ্টি থামল। সাধুবাবা চলে গেল। কিন্তু ছেলেটি সাধুবাবার কথায় দামই দিল না। বাবা যতই তাকে বলে, সে কাঠ কাটতে যায় না। হঠাৎ একদিন তার বাবা মারা গেল। তার মা তাকে খুব বকল। বলল, "এখন কে কাঠ এনে দেবে? কত করে বললাম, বাবার সাথে কাঠ কাটা শেখ্, তা তো শুনলিই না। এমন করে বলে উড়িয়ে দিস না যে, কাঠ কাঠতে কে না পারে! কাঠ কাটারও কৌশল আছে। কোনমতে কাঠ কাটলে কি আর সংসার ভালমত চলে?" এভাবে মা তাকে বকতেই থাকল। ছেলেটির কান ঝালাপালা হয়ে গেলে সে মাঠে খেলতে চলে গেল। আগের বারের মতই এবারও একই ঘটনা ঘটল। বৃষ্টি নামল, সাধুবাবার সাথে দেখা হলো, সাধুবাবা ঘরে আশ্র্রয় চাইল। ছেলেটি আগের মতই সাধুবাবাকে ঘরে নিয়ে এল। সাধুবাবাকে দেখে মায়ের পকপক করা কিছুটা থামল। সাধুবাবা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, "তুমি কি আমার উপদেশ মেনেছ? এখন কিন্তু বিপদে পড়বে।" ছেলেটি বলল, "না। আমি তা করিনি। কারণ, আমার তা করতে ভালো লাগে না। এখন বুঝতে পারছি যে, ভুল করেছি। কিন্তু এখন কি করব?" সাধুবাবা বলল, "শোননি তো! তাহলে এখনকার উপদেশগুলো শোন, আর কথামত কাজ কর। তুমি যেমন পার, সেভাবে কাঠ কাটতেই থাক, কাটতেই থাক। একদিন না একদিন দেখবে, ভালো কিছু একটা ঘটবেই। ছোটখাটো ভালো জিনিস নয়, দারুন জিনিস ঘটবে। ঐ তো বৃষ্টি থেমে গেছে। উপদেশগুলো শুনো কিন্তু। আমি যাচ্ছি।" এই বলে সাধুবাবা চলে গেল। কিন্তু এবার আর ছেলেটি আগের ভুল করল না। সে কাঠ কাটতেই থাকল। এক বছর হয়ে গেল কাঠ কাটতে কাটতে, কিন্তু কিছুই হলো না। ছেলেটি অধৈর্য্য হয়ে গিয়ে বলল, "কাল আমি কাঠ কাটতে যাব না। ধুত, ছাই! আমি কাঠ কাটতেই পারি না, কোনমতে কাঠ কেটে পান্তাভাত খেয়ে দিন কাটাই, ভাল্লাগে না। ভালো জিনিসটা কবে হবে? কাল আমি যাবই না।" এই বলে সে পরের দিনটা গেল না। তার পরের দিন সে খবর পেল, আর একজন লোক গাছ কাটতে গিয়ে গাছের মধ্যে এক পুটলি সোনার মোহর অর্থাৎ একশ স্বর্ণমুদ্রার একটা পুটলি পেল। ছেলেটি বলল, "হায়রে কপাল! কেন যে সেদিন গেলাম না? এখন থেকে প্রত্যেকদিনই আমি গাছ কাটব।" পরের বছর সে ভাবল, "এবার আর আগের ভুল করা যাবে না। দেখি, কিছু পাই কিনা।" কিন্তু সে কিছুই পেল না। পরের বছর সে এইজন্য আবার আগের ভুলটাই করল। আর সে সময়ও একই ভাবে আরেকজন লোক মোহর পেল। তিন বার একই ঘটনা ঘটল। বৃষ্টি হলো, ছেলেটি আর দৌড়াদৌড়ি খেলতে মাঠে যায় না। তাই তাদের ঘরেই সাধুবাবা এল। এসে সে আশ্রয় চাইল। সাধুবাবাকে তারা আশ্রয় দিল। সাধুবাবা বলল, "তুমি অনেকবার মিস করেছ। কেন এমন কর? আমার নির্দেশ মান না জন্যই তো এরকম হয়। এবার থেকে বলছি, কোন বছরই একটা দিনের জন্যও তুমি কাঠ কাটা বাদ দেবে না। আর যদি মোহর পাও, তাহলে সাথে সাথেই তা খেয়ে উড়িয়ে দেবে না। ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখবে। তারপর একদিন দেখবে, সেই টাকা দিয়ে তুমি অনেক কিছু করতে পারছ।" এবারও বৃষ্টি থামল উপদেশ দেয়ার পরপর। সাধুবাবা চলে গেল। এখন থেকে ছেলেটি প্রত্যেকদিন কাঠ কাটে। আর প্রতি বছর একশ মোহর পায়। জমিয়ে রাখতে রাখতে একদিন সে দেখল, অনেক টাকা হয়েছে। প্রায় পাঁচশত মোহর, যা বর্তমান বাংলাদেশী মুদ্রায় পাঁচ কোটি টাকার সমান। এবার তারা বড় একটা বাড়ি বানালো। আর ছেলেটি  বড় চাকুরির পরীক্ষায় পাস করে চাকুরি পেল।যার মাসিক বেতনই ৩০ হাজার আর এক্সট্রা ডিউটির জন্য ৫ হাজার টাকা। যদিও ছেলেটি অনেক কিছু মিস করেছে, সাধুবাবার শেষ কথা মানার জন্য এখন সে সুখী।

Thursday, October 11, 2018

Re-Use

এক ছিল একটি মেয়ে। তার বাবা বিদেশে ব্যবসা করত। তার মা আর সে একটি ছোট বাড়িতে থাকত। বাবা বছরের শেষে অনেক টাকা নিয়ে আসত। কিন্তু পুরোটা দিত না। কারণ, একবার দিয়ে সে দেখেছে, পুরো টাকাই উধাও হয়ে গিয়েছে আজেবাজে খরচে। সেজন্য এখন আর পুরোটা দেয় না। এই বছরে বাবা ফিরে এল। টাকা দিয়ে খাবার-দাবার কিনে ভালমতই খাওয়া-দাওয়া করল। মেয়ের পড়াশুনার জন্য বাবা কিছু টাকা দিয়ে গেল। প্রতি মাসের বেতন আলাদা ভাগে আর বই-খাতা কেনার খরচ আরেক ভাগে করে দুই ভাগে টাকা ভাগ করল। আর সেগুলো ধরিয়ে দিয়ে গেল। তার সাথে খাওয়ার খরচও দিয়ে গেল। এবার বাবা তাদের বিদায় জানিয়ে বিদেশে আবার ব্যবসায় ফিরে গেল। কিন্তু বই-খাতা কেনার টাকা যথেষ্ট ছিল না। বাবাকে আরও টাকা দিতে বলায় সে খাতাগুলো reuse করতে বলল। মেয়েটি স্কুলে যাওয়া পরের বছর থেকে শুরু করল। ছয় মাস যাওয়ার পর সব খাতায় লেখা শেষ হয়ে গেল। কেউ ওর মত চিপিয়ে না লিখলে এক মাসেই সব খাতা শেষ হয়ে যেত। কিন্তু বছরের তো আরো ছয় মাস বাকি আছে। তাতে কিভাবে লেখা হবে? সে বুঝতেই পারছিল না। সে এক কাজ করল। সবথেকে পুরনো খাতার পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ল। ছিঁড়ে কভার ছাড়া সেগুলো স্টাপলার করল। সেই যে কভার পেয়েছিল, অন্য বন্ধুর কাছ থেকে কিছু পৃষ্ঠা নিয়ে ঐ কভারের সাথে স্টাপলার করে দিল। এইভাবে আরো পাঁচ মাস চলে গেল। সব খাতাই এভাবে সে পুন:ব্যবহার করতে লাগল। কিন্তু সবথেকে শেষের মাসে পরীক্ষা। স্কুল থেকে খাতা দেবে না ছাই! স্কুল থেকে বলল, খাতা কিনে সেটাতে পরীক্ষা দিতে হবে। মেয়েটি তো মনে মনে শুধু বলে, "ধূত ছাই, আর ভাল লাগে না। শুধু নতুন নতুন খাতা কিনতে বলে।" সে এখন কি করবে? টিচার বলল, বাংলা লাইনের খাতায় পরীক্ষা দিতে হবে, কিন্তু দোকানে শুধু ইংলিশ লাইনের পরীক্ষার খাতাই পাওয়া যাচ্ছে। তার বন্ধুরা তাকে বলল, "তোমাকে আমরা অনেক পৃষ্ঠা দিয়েছি। এবার তুমি আমাদের খাতাগুলো বানিয়ে দাও। আমার অত পরিশ্রম করতে ভাল লাগে না বাপু! তোমার পাঁচ টাকা দিয়ে দেব। ইংলিশ পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে এই যে আমরা বাংলা পৃষ্ঠা দিচ্ছি, সেগুলো এটার সাথে স্টাপলার করে দিও। প্রত্যেকে পাঁচ টাকা করে দিয়ে দেব।" মেয়েটি পরিশ্রম করতে ভালই বাসত। সে সবার খাতা নিয়ে ভাল করে তৈরি করে দিল। ওরা সবাই খুশি হয়ে গেল। তার বন্ধুরা বলল, "কিন্তু এখান থেকে যে ইংরেজি পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়েছ, সেগুলো আর দিতে হবে না। অত পৃষ্ঠা দিয়ে আমি কি করব? আমার তো টাকার অভাব নই। বাবা প্রতি মাসে মাসেই বিদেশ থেকে আসে। আর তোমার তো বছরের শেষেই কেবল একবার আসে। তুমি ইংলিশ পৃষ্ঠাগুলো রেখে দাও। স্টাপলার করে কভার লাগিয়ে নিজের খাতা বানিও। আর পাঁচ টাকা নিয়ে নাও।" কিন্তু এখন তো বছরের শেষ। এখনো পৃষ্ঠা দিয়ে কি করবে? কিন্তু তাও সে পৃষ্ঠাগুলো কভার সহ স্টাপলার করে রাখল। পরের বছর বাবার টাকা দিয়ে চালানোর অপেক্ষায় থাকল না। পরের বছর যাতে ইংরেজি খাতা কেনার টাকা খরচ করতে না হয়, সেই বুদ্ধি বের করে সে আগে থেকেই খাতাগুলো বানিয়ে নিল। শেষে বাবা বিদেশ থেকে ফিরল। বাবা বলল, "মা ফোন দিয়ে বলেছে, তোমার পড়াশোনার খাতা নাকি তুমি বারবার রি-ইউজ করছ।" "হ্যাঁ, করছি।" "এটা ভাল বুদ্ধি, তবে এতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তাই আজ থেকে ঠিক করেছি, প্রতি বছর বেশি করে টাকা তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাব, কিন্তু তোমরা সাবধানে ব্যবহার করো।" মেয়েটি বলল, "দেখ বাবা, আমার অনেক বন্ধু আছে। সবাই অলস। আমাকে দিয়ে ওদের খাতা বানিয়ে নিয়েছে। তার সাথে আমায় যে ৫ টাকা করে করে দিয়েছে, তাতে ১০০ টাকা আমি নিজেই আয় করে নিয়েছি, দেখো।" বাবা বলল, "বাহ! ভালোই করেছ। এই ১০০ টাকা তোমার যা ইচ্ছা তা কিনতে পার। তবে এখন থেকে আমি বেশি টাকাই দিয়ে যাব। যেগুলো রি-ইউজ করার জন্য তুমি বানিয়ে রেখেছ, সেগুলো শেষ হয়ে গেলে এই টাকাগুলো দিয়ে নতুন নতুন খাতাপত্র, কলম-টলম সব কিনবে।" এরপর থেকে মেয়েটির লেখাপড়ার পুরোপুরি ঝামেলা মিটে গেল। কিন্তু অনেকের এরকম ঝামেলা মেটে না। তাই তাদের উপায় হলো রি-ইউজ করা।

Thursday, September 20, 2018

গরীবের মেয়ের জেদ

এক ছিল গরীব মা ও মেয়ে। তারা খুবই গরীব ছিল। থাকত ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে। মা এতেই শুকরিয়া আদায় করত। কিন্তু তার মেয়ে এতে খুশি ছিল না। সে সবসময় ধনী হতে চাইতো। একদিন তার আশা পূর্ণ হয়ে গেল। সে ঘুমোচ্ছিল। সকালে উঠে দেখল, সে একটি সুন্দর বিছানায় শুয়ে আছে এবং তাদের বাড়িটি দোতলা সুন্দর জমিদারের বাড়ির মত হয়ে গেছে। মেয়েটি তো খুব খুশী। খুশীতে আর বাঁচেই না। কিন্তু এখন তার কাজ করে খেতে ভাল লাগে না। মা-ই তার জন্য খাবার যোগাড় করে, আর মেয়ে বসে বসে খায়। সবসময় বাড়ির ভিতর আরাম-আয়েশেই থাকে। এমন সময় বর্ষাকাল এল। মেয়েটি তখন সকাল বেলা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ নামল বৃষ্টি। মেয়েটি একটি দোলনায় বসেছিল। সে দোলনা থামাতে থামাতেই মুষলধারে বৃষ্টি নেমে গেল। সে বৃষ্টিকে ধমক দিয়ে বলল, "কেমন বৃষ্টি তুই? দেখছিস, দোলনায় বসে আছি, একটু আরাম করছি; মধ্যে এসে নামলি মুষলধারে?" মেয়েটির বাড়ি পর্যন্ত ঢুকতে ঢুকতেই সে ভিজে জবজবা হয়ে গেল। মা তাকে বলল, "বৃষ্টিতে ভিজে গেছিস? আচ্ছা, ঠিক আছে। জামাকাপড় বদলে আয়।" মেয়ে বলল, "আশ্চর্য তো! আমরা এখন ধনী। ধনী মায়েরা কি বলে, তা জান না? বৃষ্টি হলো, আর তোমার মেয়ে তাতে ভিজে গেল। তুমি কোথায় বকে শেষ পাবে না, অথচ তুমি ঠিক আছে বলে উড়িয়ে দিচ্ছ। আমরা এখন ধনী এটা তুমি বুঝতেই পারছ না। ধুত!" এই বলে মেয়েটি কাপড় বদলে এল। দুপুরের খাবার পর মেয়েটির প্রচণ্ড জ্বর এল। মা এসে বলল, "কিরে, জ্বর হলো নাকি? বৃষ্টিতে ভিজলে তো তোর জ্বর হয় না।" জ্বরের মধ্যেও মেয়েটি মাকে ধমক দিয়ে বলল, "উহ, মা! আমরা এখন ধনী। বৃষ্টিতে ভিজলে তো জ্বর হবেই।" মা বলল, "ঠিক আছে, ঠিক আছে। এই নাও।" এই বলে মা একটা ভেজা মোজা ওর মেয়ের মাথার উপর দিয়ে দিল।" মেয়েটি রাগ হয়ে মোজাটি ছুঁড়ে ফেলে দিল। বলল, "উহ, মা! আমরা ধনী কয় হাজারবার বলতে হবে তোমাকে?  কেমন মাথায় মোজা দিয়ে চলে যাচ্ছ?  আমরা কি গরীব? যাও, ওষুধ, সাপোজিটরি, থার্মোমিটার সবকিছু কিনে নিয়ে আস।" মা বলল, "এ মা! তুমি মোজাটা ছুঁড়ে ফেলে দিলে? আচ্ছা, ঠিক আছে। এই নাও তোমার ডিক্টুরে জিনিসপত্র।" মেয়েটি ধমক দিয়ে বলল, "উহ, মা! আমরা গরীব নই। একটু ইংরেজিও তো জানতে হবে। তুমি কি বললে, ওটা তো আসলে ডাক্তারী। ওহ! আর পারি না।" এভাবে সাতদিন পর জ্বর থামল। এবার আবার শুরু হল খরা। মেয়েটি বাইরে বের হল। তার দামী খেলনা দিয়ে খেলতে। হঠাৎ এমন রোদ বের হল, যে তার মাথাই ফেটে যায়। সে রোদকে ধমক দিয়ে বলল, ইস! কেমন রোদ? একটু খেলতে বসেছি, এখন মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে। যা! কিন্তু রোদ গেল না। মেয়েটি ভীষণ রেগে গিয়ে খেলনা নিয়ে বাড়িতে চলে গেল। মাকে বলল, "শোন মা, রোদ না খুব বাজে। মাথাই পুড়িয়ে দিল।" এ বলে মেয়েটি দামী বাথটবের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর কল ছেড়ে দিল। মা বলল, "করিস কি, করিস কি? ওভাবে ঘেমে এসে কেউ গোসল করতে যায়?" কিন্তু মেয়েটি কথা শুনল না। এরপর তার ঠাণ্ডা লাগল। সেটাও বেশ কিছুদিন পরে থামল। এরকমই আরো নানারকম অসুবিধা হতে লাগল। এরপর সে মাকে বলল, "উহ! মা! ধনী হয়েও শান্তি পাচ্ছি না। একটু খেলতে বেরোলেই রোদ আসে। বৃষ্টি নামে। একদম ভাল লাগে না।" মা মুচকি হেসে বলল, "কিরে, মা! এখন তুমিই বলছ যে, ধনী হলে সমস্যা? তাহলে কি আবার গরীব হতে চাও? রোদ-বৃষ্টি এগুলো তো আসবেই। ঋতু পরিবর্তন কি হবে না? সব কি তোমার কথা শুনবে? তুমি 'যা' বললে রোদ-বৃষ্টি যাবে, আর 'আয়' বললে আসবে; রোদ-বৃষ্টি কি তোমার চাকর নাকি? শুধু গরীব হলে এগুলোতে তোমার কষ্ট হয় না। ধনী হয়েছ, তাই এগুলোতে তোমার কষ্ট হচ্ছে।" মেয়ে মায়ের এত বকবকানি শুনে অস্থির হয়ে গেল। সে মাকে বলল, "উফ, মা! এত জ্ঞান দিও না তো! এত্থেকে গরীব হলেই বেশি ভাল।" এরপর থেকে মেয়েটি গরীব হতেই চায়। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখল, তারা আবার গরীব হয়ে গেছে। প্রথমে তো মেয়েটি বলল, "বাহ! বাঁচা গেল।" এবার সে কয়েকদিন রোদ-বৃষ্টির মধ্যে খেলল, কিন্তু কিছু হলো না। কিন্তু তার আবার গরীবদের খাবার খেতে ভাল লাগে না। নোংরা কুঁড়েঘরে থাকতেও আর ভাল লাগে না। সে আবার ধনী হতে চাইল। ধনী হবার পর আবার গরীব হতে চাইল। এরকম করে কাহিল হয়ে গেল। তার মা বলল, "এমন করছ কেন? সবকিছুতেই কিছু না কিছু সমস্যা আছে। বারবার ধনী-গরীব করে আমাকে আর ক্লান্ত করো না। নিজে তো ক্লান্ত হচ্ছই, আমাকেও ক্লান্ত করছ। চুপচাপ ধনী হবে নাকি গরীব হবে বেছে নাও। নয়তো মানুষকে শুধু জ্বালাতনই করে যাও। যত্তসব!"

Sunday, September 9, 2018

লোভ ও অলসতার ফল

এক ছিল একটি মেয়ে। আর গল্পটি খুব আজব। মেয়েটি একটি বাড়িতে থাকত। তার বাড়ির কাছে একটি পরীর বাড়ি ছিল। পরীকে কিছু দিলে তার বিনিময়ে পরী কিছু একটা দেয়। সবসময় দেয় না। যদি প্রাণ বাঁচানোর মত বড় কোন উপকার কেউ করে, তবেই তাকে পরী সাহায্য করে। কিন্তু মেয়েটি তার বন্ধু হওয়ায় মেয়েটি তার জন্য অল্প উপকার করলেও সে মেয়েটিকে সাহায্য করে। মেয়েটির নাম ছিল নেলী। নেলী ছিল খুব গরীব। সবসময় পান্তা ভাতই তার কলাপাতার (প্লেট) মধ্যে থাকত। সে একদিন পরীর বাড়ি গেল। গিয়ে বলল, "আমার আর গরীব থাকতে ভালো লাগছে না। সবসময় পান্তা ভাতই জোটে। মাঝেমধ্যে কিছুই জোটে না। কেন গো? আচ্ছা, তোমার কি কোন সাহায্য লাগবে? তাহলে কিন্তু আমায় পান্তা ভাত খাইয়ে আর রাখা যাবে না।" পরী বলল, "ঠিক আছে। অনেকদিন হয়ে গেল আমি কোথাও বেড়াতে যাই না। ইচ্ছে করছে এক্ষণি অদৃশ্য হয়ে আধুনিক মানুষের শহরে চলে যাই। গিয়ে দেখি, অনেক দিন আগে গিয়ে যে দেখেছিলাম হাতে ধরা মোবাইল না কি জানি তৈরি করা হয়েছে। না জানি কত কি তৈরি হয়ে গেল। আমার এসব দেখতে খুবই ভালো লাগে। কিন্তু আমার যে একটা ছোট ছাগলের বাচ্চা আছে। ওকে তো নিয়মিত খাবার খাওয়াতে হয়। ওকে মাঠে ছেড়ে দিতে হয়, খাবার নিয়েও আসতে হয়। নদীতেও নিয়ে যেতে হয় গোসল করার জন্য। এসব করবে কে? তুমি যদি এসব কাজ করে দাও এক সপ্তাহের জন্য, তাহলে আমি তোমার ইচ্ছা পূরণ করব।" পরী এরপর শহরে গেল। গিয়ে ঘরে ঘরে কম্পিউটার, স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট দেখতে পেল। আনন্দের সাথেই ৭ দিন কেটে গেল। ওদিকে নেলীও ছাগলের বাচ্চার খেয়াল রাখল। পরী তার সুন্দর ছাগলের বাচ্চাকে দেখতে পেয়ে খুব খুশী হয়ে গেল। সে বলল, "অনেক ধন্যবাদ। আমার ছাগলের বাচ্চাটাকে তুমি অনেক্ষণ দেখে রেখেছ। এবার বলতো, তুমি কি চেয়েছিলে? আগে আগে বললে আমার শুনতে অসুবিধা হয়। এখন তুমি যা বলবে, তাই শুনব।" নেলী বলল, "শোন পরী, আমি খুব গরীব। প্রতিদিন পান্তা ভাত জোটে। সেটা বন্ধ করতে হবে। অন্তত একটু ভালো খাবার তো দাও।" পরী বলল, "শুধু খাবারই কি চাই? তুমি আমার বন্ধু। তাই গিয়ে দেখো, তুমি যা চাচ্ছ তা পেয়ে গেছ।" নেলী ঘরে গেল। গিয়ে দেখল, "তার ঘর ভাঙ্গা কুঁড়েঘর নেই। যত ভাঙ্গা ছিল, সব ঠিক হয়ে গেছে। ঘরের চাল টিনের চাল হয়ে গেছে। আর পুরনো জিনিসপত্র সব নতুন হয়ে গেছে। সে যে পান্তা ভাত রেখে এসেছিল, সেটা ভাত, মাছ-মাংস এবং ডিম হয়ে গেছে।" নেলী সেদিন খুব খুশী হলো। কিন্তু এক সপ্তাহ পেরোনোর পর সে আবার গেল পরীর কাছে। বলল, "আমার না এরকম ভালো লাগছে না। শুধু ভাত, মাছ, মাংস বোরিং হয়ে গেছে। আর তোমার মত ভালো পরীর বন্ধু আমি। আমি গরীব থাকলে কেমন দেখায়? দাও না আমায় আরেকটু ধনী করে।" পরী বলল, "ঠিক আছে, তাহলে আমাকে কিছু পিঠে ভেজে দাও। কারণ, খুব বেশী দূরে নয় সেখানে আমার এক অসুস্থ বন্ধু আছে। সুস্থদের কাছ থেকে আমি কোনকিছুর বিনিময়ে সাহায্য করি। কিন্তু অসুস্থদের তো এমনি এমনিই সাহায্য করতে হবে, তাই না? পিঠেগুলো আমি আমার অসুস্থ বন্ধুর কাছে নিয়ে যাব।" নেলী পিঠেগুলো ভেজে দিল। এবার বাড়ি গিয়ে সে দেখল, তার একটা দোতলা বিল্ডিং হয়েছে। টাইলস দিয়ে বানানো। অনেক সুন্দর বড় বড় বারান্দা। সুন্দর বেডরুম। বিছানাও আছে। আর খাবারের জায়গায় গিয়ে দেখল, রোস্ট আর পোলাও রাখা আছে। সাথে দুধও রাখা আছে। সে খুবই খুশী হয়ে গেল। এভাবে দু'সপ্তাহ কাটল। এবার নেলীর আবার এরকম থাকতে বোরিং লাগা শুরু হলো। সে আবার পরীর কাছে গেল। বলল, "আমার এমনি এমনি ভালো লাগছে না। আমার জন্য একটা কথা বলার টিয়ে পাখি দিতে পারবে? আরেকটা বাগানও দিয়ে দাও। তবেই আমার খুব ভালো লাগবে। জীবনটাই সুন্দর হয়ে যাবে। দাও না গো! কিন্তু তার বদলে কি চাও?" পরী বলল, "ঠিক আছে, আমার বেশি একটা ভালো লাগছে না। তুমি এক কাজ কর। আমার ছাগলটিকে একটু দুধ খাওয়াও। আর আমার বাগানে একটু পানি দিয়ে আস। দেখবে, তুমিও পোষা প্রাণী এবং বাগান পেয়েছ।" সব ঠিকমতই হলো। নেলী বাড়ি গিয়ে দেখল, সুন্দর একটা ফুলেরর বাগান এবং কথা বলা একটা টিয়া পাখি তার বাড়ির সামনেই আছে। কথা বলা টিয়ে পাখি বলল, "তুমি কি আমার নতুন মালিক? তোমার নাম কি নেলী? আমায় কোন শিখাতে হবে না, এমনিতেই সব পারি।" নেলী খুব খুশী হলো। বাগান এবং কথা বলা তোতাপাখি নিয়ে সে আনন্দেই চলল। কিন্তু একদিন তার তাও খারাপ লাগতে শুরু করল। সে আবার পরীর কাছে গেল। গিয়ে বলল, "আমার বাগানের ফুল দিয়ে দুটো মালা বানিয়ে এনেছি। একটা তুমি পর, একটা তোমার ছাগলকে পরাও। কিন্তু আমাকে আরো কিছু দাও, দয়া কর।" পরী বলল, "এতেও মন ভরল না? আচ্ছা ঠিক আছে, গিয়ে দেখ তুমি প্রাসাদ পেয়েছ।" সে প্রাসাদই পেল। অনেক রকম ফুল পেল। এটা তার খুবই ভালো লেগেছিল। তাও এক মাস পর তার এটা আর ভালো লাগে না। সে আবার গেল পরীর কাছে। বলল, "আমাকে আরো অনেক ধনী করে দাও, যাতে আমি বাড়ির মধ্যেও পালকিতে চড়ে ঘুরতে পারি। আমায় এত এত সুখী করে দাও, যাতে আর আমার কোন কাজই করার দরকার পড়ে না। অনেক অনেক সুখী করে দাও।" পরী বলল, "তোমার জেদ তো কম নয়। বন্ধু বলে এত জেদ তো রাখা যায় না। শোন না, তুমি আমার কাছে আর এসো না তো! এসে কেমন আছ, কি করছ- গল্প-টল্প না করে শুধু বলছ, ধনী করে দাও। এসব আর ভাল লাগছে না। আচ্ছা ঠিক আছে, শোন তবে। তুমি তো অনেক কঠিন কঠিন জিনিস চাচ্ছ। কিন্তু বিনিময়ে তো সহজ সহজ জিনিসই তুমি দিচ্ছ। এবার একটু কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। যদি তুমি আমার কথা শোন, আমি বিনিময়ে যা চাইব তা দিতে পার, তাহলে তোমাকে আমি তুমি যা চাও তা দেব। আর যদি তা না পার, তাহলে কি হবে তা পরেই দেখতে পাবে। শোন তবে। পরীক্ষাটা কি, সেটাই তো বললাম না। পরীক্ষাটা হলো, আমার ছাগলের দুটো পাখা গজিয়ে দাও, যাতে সেও আমার সাথে বেড়াতে পারে। আমার এই জেদটা তোমাকে পূরণ করতে হবে।" এরপর নেলী বলল, "আমি তো আর তোমার মত পরী নই। এটা তো আর আমি করতে পারব না। অন্য কিছু করতে বল।" এবার পরী বলল, "ঠিক আছে, তুমি তো ধনী হতে চাও। আমি তোমায় ধনী করে দেই। কিন্তু তুমি যে বললে, তোমার কোন কাজ করার দরকার হবে না এরকম ধনী করে দেই, তাহলে আমিও বলতে পারি, আমাকে এমন ধনী করে দাও, যাতে আমার পোশাকটুকু পর্যন্ত সোনার হয়। দাও ধনী করে। মানুষের পক্ষে তো কাজটা সম্ভব, কিন্তু টাকায় কুলাতে হবে।" তখন নেলী বলল, "না না না, এটাও যে পারব না। আমি করতে পারব এরকম কিছু দাও।" পরী বলল, "ঠিক আছে, আমি তোমায় আরেকটা কাজ দেব। কিন্তু কাজটা দেব তুমি যা চাইছ তা আমি দেয়ার এক মাস পরে।" তাই হলো। কাজ না করে করে নেলী খুবই অলস হয়ে পড়েছিল। কোন কাজই সে আর করতে চায় না। এবার পরী এসে হাজির হলো। বলল, "আমার কাজের কথা মনে আছে? কাজটা হলো, এই পুরো বাড়িটা একনাগাড়ে দৌড়ে আমাকে দেখাও। থামবে না কিন্তু। তুমি যখন আগে অনেক গরীব ছিলে, তখন এটা তো তোমার কাছে পানির মত সোজা লাগত। এখন দেখাও আমাকে এ কাজটা করে।" নেলী বলল, "ঠিক আছে, আগে তো এ আমার বাম হাতের কাজ ছিল। কিন্তু এখন কেন পারব না? এক্ষুণি দেখাচ্ছি।" সে তখন শুয়ে ছিল। সে দুই হাত জাগিয়ে আড়মোড়া দিয়ে উঠল। সে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই সে বলল, "পরী! আমি যদি পালকিতে উঠি, আর দাসীরা যদি আমায় দৌড়ে পালকিটা চালিয়ে চক্কর দিয়ে আনে, তাহলে হবে তো?" পরী বলল, "সে কী! আমি যা বলছি, তা করতে হবে। এক-দুই-তিন বলার সাথে সাথে দৌড় দেয়া শুরু করতে হবে। খেয়ে খেয়ে মোটাও তো কম হওনি। এবার দৌড়াও- এক, দুই, তিন।" কিন্তু নেলী দৌড়ানো শুরু করতে পারছিল না। সে দৌড়ানোর জন্য এক ধাপ দিল, কিন্তু তার শরীর ঘুমে ঢলতে থাকল। চোখে শুধু ঘুম আর ঘুম। মোটা হওয়ার কারণে একটু বেশি চেষ্টা করাতে সে মাটিতে পড়ে গেল। তখন পরী বলল, "শোন নেলী! তোমার সব খাবার আমি বন্ধ করে দিলাম, যতক্ষণ না তুমি দৌড়ে দৌড়ে চিকন হয়ে যাচ্ছ। শুধু পানিটুকুই আমি দিয়ে যাচ্ছি।" এই বলে পরী উড়াল দিয়ে চলে গেল। নেলী বলল, "দাঁড়াও।" কিন্তু পরী দাঁড়ালো না। অমনি নেলীর খিদে পেয়ে গেল। সে দাসীকে ডাকল। "দাসী! যাও তো! এক বাটি ফল নিয়ে এসো।" দাসী বলল, "বাটিতে যা ফল ছিল, তা তো এক্ষণি দেখছিলাম। হঠাৎ দেখি ফলগুলো নেই। ফ্রিজও খালি। শুধু পানির বোতলগুলিই রয়ে গেছে।" নেলী বুঝতে পারল, সে কত ভুল করেছে। সে আবার পরীকে ডাকল। "পরী! আমি তোমার বন্ধু। একবার এসো। শুনে যাও। আর কিছু চাইব না। শুধু শুনে যাও।" পরী বুঝল যে, নেলী কি বলতে পারে। পরী উড়াল দিয়ে নেলীর ঘরে গেল। সে বলল, "কি হলো, নেলী? আমায় ডাকছ কেন? এখনো তো দৌড় শুরুই করলে না! তাড়াতাড়ি দৌড় শুরু কর।" নেলী বলল, "না গো না, আর এ অবস্থায় দৌড়াতে পারব না। তোমার বন্ধু হয়ে চাচ্ছি যে, আমাকে চিকন করে দাও।" পরী বলল, "উহ! আর কত কি চাইবে? ঠিক আছে।" পরী রেগে গিয়ে আগে যেরকম পান্তা ভাত খেয়ে কাটাতে হতো, চিকন ছিল, সেরকম নেলীকে করে দিল। সব দাস-দাসী উধাও হয়ে গেল। সে খুবই চিকন হয়ে গেছে। ঘর-বাড়িও ভাঙ্গা চোরা সেই আগের মত হয়ে গেছে। আর কলাপাতার উপর পান্তাভাতই রাখা আছে। নেলী এখন পরীকে বলল, "আমি তোমার কাছে আর কিছু চাইব না। তোমার প্রাসাদ তো তুমি নিয়েই নিলে। তোমার পাখি এবং বাগান- তাও তো নিয়ে নিলে। কিন্তু এবার আমাকে এরকমও করে দিলে। ভালোই করেছ! বন্ধু হয়েও এখন আমাকে আবার গরীব করে দিলে? কি করলে?" পরী বলল, "তোমার সাথে আমার আর কোন বন্ধুত্ব নেই এখন। তুমি দ্বিতীয়বার যেরকম বাড়িতে ছিলে, টিনের চাল আর ভাত-মাছ-মাংস, সেরকমই হয়ে যাও। আর বেশি চাইবে না। তোমার সাথে আমার বন্ধুত্বও শেষ, পুরোপুরি গরীব বা পুরোপুরি ধনী হওয়াও শেষ।" এই বলে পরী নেলীকে দ্বিতীয়বার যেরকম ছিল সেরকম করে দিল। আর পরী উড়াল দিয়ে চলে গেল। তবে এটা নেলীর জীবনে বড় একটা শিক্ষাও ছিল।

Friday, August 31, 2018

পঙ্ক্ষীরাজ গরু ও জোনাকির মালা

এক ছিল এক সুখী পরিবার। সেই পরিবারে থাকত মা, বাবা ও ভাই-বোন। কিন্তু একদিন একটা বড় ঝড় এল। এমন ঝড় এল, যে বাড়িও উড়াল না, মা-বাবাকেও উড়াল না। কিন্তু শুধু ভাই-বোনকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। ভাইয়ের নাম ছিল রবি, আর বোনের নাম ছিল ছবি। রবি আর ছবি গিয়ে পড়ল এক আজব জায়গায়। তারা সবকিছু ভুলেও গেল, কিন্তু একে অপরকে চিনত। সেই জায়গায় শুধুমাত্র ছিল একটি কলাগাছ, একটি গরু ও একটি নদী। নদীর পানি ছিল খুব পরিস্কার। খাওয়ার উপযোগী। তাদের মাথায় বুদ্ধি ছিল খুব। তারা ঠিক করল, কলা, দুধ এবং পানি খাবে। এবার এসব খেতে খেতে এক মাস পেরিয়ে গেল। আরো এক মাস পেরিয়ে গেল। এরকম করতে করতে খাবারগুলো তাদের কাছে বোরিং (একঘেয়ে) হয়ে গেল। তাদের আর শুধু এরকম খেতে ভাল লাগে না। তারা কি খাবে? কিন্তু তাদের মাথায় বুদ্ধি ছিল আগেই বলেছি। তাই তারা লাকড়ি যোগাড় করল। মাটি দিয়ে একটি পাত্রও বানালো। পাথরের সাথে পাথর ঘষে এবার আগুন জ্বালালো। তারপর পাত্র আগুনের উপর বসালো। আর পাত্রের মধ্যে দিল কলার থোড়। তৈরি হল সুস্বাদু সবজি। আরো এক মাস এই সবজি খেয়েই কেটে গেল। তারপর তাদের মনে হলো, স্বাদটা ভালো লাগছে না। রবি ছবিকে বলল, "শোন! তোমার কি এটা খেতে ভাল লাগছে? আমার তো আর ভালই লাগছে না।" ছবি বলল, "নতুন একটা রেসিপি তৈরি করা যাক। দুধ আর কলার ভর্তা বানালে কেমন হয়?" রবি বলল, "তাহলে তো দারুনই হয়। খেয়ে দেখে যদি মজা লাগে, তাহলেই তো হয়।" এরপর তারা শুরু করল এবং কলা ও দুধের ভর্তা বানালো। কলা ও দুধের ভর্তা বানিয়ে তারা খেল। এভাবে বদল করে করে অনেকদিন কেটে গেল। একদিন তাদের মনে পড়ে গেল তাদের বাড়ির কথা। ছবি বলল, "এই রবি! তোমার মনে আছে, একটা ঝড় আসল, আর কি জানি একটা হলো? তারপর থেকেই দেখি আমরা এখানে।" তখন রবি বলল, "তাই তো? কি হবে এখন? ভুলেই তো গিয়েছিলাম। এতদিন কিছুই মনে পড়েনি। ভেবেছিলাম, এখানেই জন্ম আমাদের।" এরপর হঠাৎ আকাশ থেকে একটি সুতা পড়ল। আর সুতার সাথে একটা কাগজ বাঁধা। সেই কাগজে লেখা: "এই সুতো দিয়ে কলাপাতা গরুর গায়ে বেঁধে দাও। গরুটা তখন উড়তে পারবে, পঙ্ক্ষীরাজের মতই কাজ করবে। কিন্তু মনে রেখো, সেটা হলো, সেই গরু এমন পথ দিয়ে যাবে, যেই পথ মন্ত্রপুত এবং সেই পথে গেলেই খিদে পায়। সেজন্য খাবার নিয়ে যেতে হবে। আর তখন এমন কিছু নিয়ে যেতে হবে, যেটা কোনদিন খাওয়া হয়নি। সব পরিচিত খাবারই যদি কেউ খায়, তাহলে গরু ওড়া বন্ধ করে দেবে। গরুটা যদি নদীর উপর দিয়েও যেতে থাকে, তাহলেও গরুটা নদীর মধ্যে গিয়েই পড়বে। সবগুলো ধাপ ঠিকমত মেনে চললে তবেই তোমরা বাড়ি পৌঁছাতে পারবে এবং মা-বাবাকে দেখতে পাবে। যত তাড়াতাড়ি চাও, তত তাড়াতাড়ি গোছগাছ শুরু করে দাও।" রবি ও ছবি দুজনেই কাগজটা ভাল করে পড়ল। একে অপরের দিকে তাকালো। তারপর রবি বলল, "প্রথম কাজটা তো খুবই সহজ, সুতো দিয়ে কলাপাতা গরুর গায়ে বেঁধে দিতে হবে। কিন্তু নতুন খাবার আর কি আছে। আসলে আমরা খাবার বদলে বদলে ভুল করে ফেলেছি। এখন তাহলে কি করা যায়?" তখন ছবির মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। সে বলল, "এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দিচ্ছ কেন? নিশ্চয়ই আশেপাশে কিছু একটা আছে।" তারপর হাঁটতে হাঁটতে দেখল, দূরে অনেক মাছি ওড়াওড়ি করছে। ছবি দেখতে গেল। গিয়ে দেখল, একটা ছোট্ট গাছ। সেই গাছে আঙ্গুরের মত দেখতে কিন্তু বাদামের মত শক্ত একটা ফল। আর কয়েকটা নিচে পড়ে গেছে, আর গন্ধটাও খুব সুস্বাদু। আর ওগুলোর চারপাশ দিয়েই মাছি শুধু ঘোরাঘুরি করছে। ছবি কিছু কিছু ফল নিয়ে নিল। রবিকে সব ঘটনা বলল। রবিও গিয়ে কিছু ফল তুলে আনল। কলাপাতা বাঁধার পর দু'জনেই গরুর পিঠে উঠে বসল। আর গরুটি উড়তে শুরু করল। তারা উড়তে থাকল, কিন্তু তাদের খিদেই পাচ্ছিল না। এক জায়গায় এসে হুট করে অনেক খিদে পেয়ে গেল। তারা ফলগুলো খেতে শুরু করল। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি তা শেষ হয়ে গেল। এখন তাদের তরল কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। কি খাবে? ভেবেই পাচ্ছে না? এমন সময় তারা দেখতে পেল, একটা মৌচাক। মৌচাক থেকে টুপ টুপ মধু পড়ছে। অমনি তারা গরুটি নিচে নামিয়ে মৌচাকের কাছে হা করে বসল। আর কয়েকটা ফোঁটা তাদের মুখে পড়তে না পড়তেই গরুর কলাপাতাগুলো ছিড়ে গেল। এরপর তারা নিচেই বসে রইল। তাও ভাল, একটু নিচে এসে পড়ল। নাহলে তো মরেই যেত। এখন একে অপরকে বলাবলি করল, "ইস! কেন যে মধুটা খেতে গেলাম? তুমি আমাকে মনে করিয়ে দিলে না?" "আরে, আমি কি মনে করাব, তুমিই তো মনে করালে!" এরকম করে ঝগড়াই করতে লাগল। অবশেষে ঝগড়া থামল। এখন তারা কি করবে? ভেবেই পাচ্ছিল না। হঠাৎ তাদের মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সামনেই এক নদী। আর নদী পেরোনো যাবে চারপাশের কাঠ দিয়ে নৌকা বানালে। তারা তাই করল। নদী পার হয়ে গেল। তারপর তারা আবার একটা গুহা দেখল। সেই গুহার মধ্যে তারা ঢোকার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। গুহা পুরো খোলা, তাও ঢুকতে পারছে না। বোধহয় কোন অদৃশ্য দরজা। হঠাৎ টাকাটাকি করতে করতে ভিতর থেকে আওয়াজ আসল। কে যেন বলে উঠল, "কে রে আমার গুহায় ঢুকতে চাচ্ছে? কে আমার গুহায় ঢুকতে চাচ্ছে, নামটা বল শুনি? ভয় পেয়ো না, কিছু বলব না। কিন্তু নামটা বল। টাকাটাকি করছ কেন? শুধু নামটা বল, টাকাটাকি করো না।" ওরা জবাব দিল, "আমরা দু'জন রবি আর ছবি। কিন্তু তুমি কে?" অদৃশ্য দরজা খুলে গেল। রাক্ষসের মত একজন মানুষ এসে দাঁড়ালো। সে বলল, "আমায় দেখে ভয় পেয়ো না কিন্তু। কি হয়েছে, আমাকে বল। আর দাসী, তুমি বাইরে চলে এসো। এরা কি করতে এসেছে, তা জিজ্ঞাসা কর।" একটু পর একটা পরী আসল। সে বলল, "কি গো? কিছু বুঝতে পারলে তোমরা দুজন রবি আর ছবি? আমার চুল দেখেও কিছু বুঝতে পারলে না? আসলে এই দৈত্যই তো আমাকে পাঠিয়েছিল তোমাদেরকে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু তোমরা এটাও চিনতে পারলে না? যে রশিটা কাগজের সাধে বেঁধেছিলাম, সেটা আমারই চুল। কিন্তু তোমরা ভুল কাজ করেছ। মধুটা খেলে কেন? এবার আমি কি করব? চলে যাও এখান থেকে। বিরক্ত করো না। আর এদিকে এসো না। যেখানে খুশী যাও। সাহায্য করতে চেয়েছি, সবকিছূ তো মানলেও না।" এই বলে আর অদৃশ্য দরজা নয়, বরং দৃশ্যমান দরজাই পরী বন্ধ করে দিল। রবি আর ছবি কি করবে? এমন সময় একটা জোনাকি পোকা আসল। জোনাকি পোকা এই রূপকথার রাজ্য ছেড়ে মর্ডার্ন রাজ্যে গিয়েছিল। অর্থাৎ, আমাদের এই সমাজে। সেখানে গিয়ে সে বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে একটা Animal Talking Converter নিয়ে আসল। এরপর রবি ও ছবির সাথে কথা বলা শুরু করল। সে বলল, "শোন রবি ও ছবি! আমি তোমাদের সাহায্য করতে চাই। কি চাও তোমরা, বল? কিন্তু সেজন্য আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। করবে নাকি আগে বল।" তখন রবি বলল, "ঠিক আছে! যদি আমরা কাজটা করতে পারি, আমাদের বাড়ির পথ দেখিয়ে দিও।" জোনাকি পোকা বলল, "শোন তবে। আমার অনেকদিনের শখ, গলায় একটা মালা পরব, কিন্তু আমার সাইজের মালা কোথাও নেই। তাই তা তোমাদের বানিয়ে দিতে হবে। তাহলে আমি তোমাদের বাড়ির পথ দেখাব।" রবি ও ছবি হেসে ফেলল। জোনাকি বলল, "হাসার কি হলো? আমার কি শখ-আহলাদ থাকতে নেই? এই তো ছবি একটা মালা পরে আছে। কী সুন্দর! আর আমার সাইজের মালা কেউ বানায় না! একদম হাসবে না। হাসলে কিন্তু পথই দেখাবো না। দাও, আমায় আমার সাইজের মালা দাও।" ছবি রবিকে বলল, "এ তো আমার বাম হাতের কাজ। আমি এক্ষণি বানিয়ে দিচ্ছি। তুমি দেখ, জোনাকি পোকা কোথাও হারিয়ে না যায়।" এই বলে ছবি একটা শিউলি ফুল নিল। পাঁপড়িগুলোকেও ছোট ছোট ভাগ করল। এরপর একটু একটু করে মালাটা গেঁথে শেষ করল। জোনাকি পোকাকে বলল, "এই নাও, তোমার মালা। তুমি এখন সেজেগুজে আমাদের পথ দেখিয়ে দাও। নাহলে কিন্তু আবার তোমার ঐ মালা ছিড়ে দেব, আর বানিয়ে দেব।" জোনাকি পোকা বলল, "আমি কি কথার খেলাপ করি নাকি? চল, আমার পিছ পিছ আস। কিন্তু অন্য কোথাও মনোযোগ দিও না। আমি কিন্তু খুব দ্রুত উড়ি। একটুতেই কিন্তু হারিয়ে যেতে পারি। না দৌড়ালে আমার সাথে তাল মেলাতে পারবে না। তাহলে দৌড় দাও।" এই বলে জোনাকি ওড়া শুরু করল। ছবি ও রবি পিছ পিছ দৌড়াতে শুরু করল। এরপর তারা খুবই সাবধান ছিল। আগে যেমন ঠিক ঠাক কাজ করেনি, এবার তা করলে চলবে না। অবশেষে তারা বাড়িতে পৌঁছালো। মা-বাবা তাদের পেয়ে বলল, "কোথায় ছিলি এতদিন? কোথায় গিয়েছিলি? কেন গিয়েছিলি? রাতে তো ঝড় এল। তার পরদিন থেকেই তোরা নিখোঁজ। তোদের পাওয়াই যায় না। কত খুঁজেছি তোদের? কোথায় গিয়েছিলি তোরা?" রবি ও ছবি একটু বিশ্রাম নিয়ে পুরো ঘটনাটা মা-বাবাকে বলল। এরপর মা-বাবা বলল, "ভাগ্য ভাল তোরা ফিরে আসতে পেরেছিস। তাও ভাল জোনাকির কথা মেনেছিস। কিন্তু জোনাকির মালার কথাটা কিন্তু খুব মজার ছিল। তোরা ফিরে এসেছিস, এটাই আমাদের সান্ত্বনা।"

Saturday, August 11, 2018

কলমি শাক আবিস্কার

এক ছিল এক গ্রাম। সেই গ্রামে জলাশয়ের কোন অভাব ছিল না। কিন্তু সেই দেশের লোকেরা একটা জিনিসে বিরক্ত হতো। কারণ বেশির ভাগ জলাশয়েই জঙ্গল হতো। আসলে সেগুলো কলমি শাক ছিল। সেই দেশের মানুষ তাকে খাদ্যই মনে করত না। এটা নিয়ে তারা কখনো ভাবেইনি। তারা ভেবেছে এসব হয়তো জঙ্গলী গাছ। পাশের দেশে আবার খাদ্যের খুব আভাব। অনেকে না খেয়ে মরে যাচ্ছে। তাদের খাবার খোঁজারও শক্তি ছিল না। না খেয়ে অনেক কাহিল ছিল। সবারই অসুখ খাবারের অভাবে।একজন ছিল খুব শক্তিশালী। সে ভাবল, আমার ভাই বোনদের আর মরতে দেয়া চলে না। এই ভেবে সে সবার বাড়ি গেল। বলল,"তোমাদের চার ভাগ খাবারের এক ভাগ কি আমায় দেয়া যায়।ভায়েরা, তোমাদেরই লাভ। আমার শক্তি হলে তোমাদের সবার জন্যই খাবার আনব। তখন পেট ভরে খেয়ো।চার দানা ভাতের এক দানা আমায় দাও।" সবাই তাকে চার ভাগের এক ভাগ খাবার দিল। কেউ খুশি হয়ে দুই ভাগও দিল। লোকটি সব খাবার খেয়ে একটু তরতাজা হলো। তারপর সে পাশের দেশে খবর নিতে গেল। সে এত্‌তো জলাশয় দেখে খুব খুশি হল। তবে আসল খুশি হলো কলমি শাক দেখে। কিন্তু সে ভাবতে লাগল, ইস! এরা কি এসব নেয়ার অনুমতি দেবে? টাকা ছাড়া? এটা ভাবতে ভাবতেই একজন লোক আসল। হয়ে গেল মেঘ না চাইতেই জল। সে বলল, "ভাই! দেখুন তো, আমার তিনটে জলাশয়। তিনটে জলাশয়ের মধ্যেই এসব জঙ্গল বেরিয়েছে। আপনি মেহেরবানি করে আমার এ জলাশয় তিনটি একটু পরিস্কার করে দিতে পারেন? আমি আপনাকে এর জন্য টাকাও দেব।" লোকটি খুশীর চোটে আত্মহারা হয়ে গেল। কিন্তু সে ভালো লোকও ছিল। তবে চালাকও ছিল। সে আগে বলল, "ঠিক আছে।" এই বলে সে সব জঙ্গল সাফ করল। সে তো খুশীই হলো যে, কলমি শাক খেয়ে না জানি কত্‌তো খুশি হবে সবাই! আর বাকি যে টাকা, তা দিয়ে চাল কিনব। ভাত দিয়ে কলমি শাক খাবে সবাই। বেশ মজা হবে।" সে জঙ্গল পরিস্কার করার পর টাকা নিয়ে মনের আনন্দে নিজের দেশে ফিরে গেল। সবাইকে খাবার খাওয়ালো। সবাই খুব খুশি হলো। কিন্তু লোকটি ভালো লোক হওয়াতে সে আবার ঐ দেশে গেল। সে বলল, "ভাইসব! তোমরা একটা কথা শুনবে? এমন কোন পুকুর কি তোমাদের কাছে আছে, যাতে সবসময় তোমরা যেটাকে জঙ্গল বল সেটা হয়?" তখন একজন বলল, "উত্তর দিকে অনেক এরকম জলাশয় আছে।" তখন লোকটি বলল, "ঠিক আছে। এর অর্ধেক সংখ্যক জলাশয় আমার কাছে বিক্রি করে দিতে হবে। তাহলে তোমাদেরকে আমি এক নতুন খাবারের সন্ধান দেব। এতে তোমাদের জলাশয়ও পরিস্কার থাকবে, আবার পেটও ভরবে। বুঝতে পেরেছ নিশ্চয়ই? নাকি আরো সহজ ভাষায় বলে দেব?" সবাই বুঝে গেল। সেই দেশের মানুষ আবার সৎ ছিল। সে অর্ধেক সংখ্যক জলাশয় তার কাছে বিক্রি করে দিল। আর বাকি জলাশয় থেকে শাক উঠিয়ে উঠিয়ে প্রথমবারের মত রান্না করে খেল। তারপর বলল, "ভাই! তুমি একটা বড় উপকার করলে। তোমাদের দেশের মতনই মাঝেমধ্যে আমাদের দেশেও খাবারের আকাল পড়ে। আমরা আসলে ভাবতাম, জঙ্গল না হয়ে যদি কোন খাদ্য হতো! আসলে এগুলোই দেখি খাদ্য। কেন যে আগে বললে না!" তারপর লোকটি অর্ধেক সংখ্যক জলাশয় কিনে নিয়ে মনের সুখে দেশে ফিরে গেল। আর সে ঐ জলাশয় থেকেই সবাইকে একটু একটু করে সবাইকে সবসময় শাক দেয়। কারো দরকার হলেই একটুখানি দিয়ে দেয়। আর যেই দেশের লোকেরা এটা খাওয়া জানত না, তারাও এখন এসব খেতে পারে, আর খাবারের আকাল পড়লেও কলমি শাক খেয়ে বাঁচে।

Friday, August 10, 2018

মোটকা ছেলে আর শুটকি ছেলে

এক ছিল এক লোক। তার ছিল দুই ছেলে। তবে দুইজন খুবই আলাদা। একজন সুইয়ের মতন শুটকি, আবার আরেকজন ঢোলের মতন মোটকা। মোটকার তো নড়তে চড়তে সময় লাগে, এটা হলো তার সমস্যা। আর সে শুটকির গায়ের উপর পড়লে শুটকি হেরে যায়, এটা শুটকির সমস্যা। তবে শুটকি হেরে গেলে সেটা আবার মোটকা পছন্দ করে। আবার শুটকি নিজেও শুটকি, তার নখও শুটকি আর ধারালো। মোটকার সাথে যখন সে পারে না, তখন নখ দিয়ে একটা খোঁচা দিয়ে দেয়। তখন মোটকা আবার হেরে যায়। এই নিয়ে লোকটির ভীষণ সমস্যা। তার ছেলেরা ২৪ ঘন্টা মারামারি করে। খেতে বসলেও একজন আরেকজনকে গুঁতা দেয়। মোটকা তো খাওয়ার সময় শুটকিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চায়, আর শুটকি শুধু নখ দিয়ে মোটকাকে গুঁতাতে চায়। ঘুমাতে গেলেও শুটকি নখ দিয়ে মোটকাকে খোঁচায়, আর মোটকা শুধু শুটকিকে চেপে ধরতে চায়। সেইজন্য লোকটি সবসময় মাঝখানে শোয়। যাইহোক, ছেলেরা বাবার কাছে আবার ভদ্র। বাবার সাথে আর কিছুই করতে পারে না। তবে বাবার মাথার উপর দিয়ে মাঝেমধ্যে দু'জনেই মুখ উঠিয়ে চোখ রাঙিয়ে একে অপরের দিকে তাকায়। বাবার এই এক সমস্যা। স্কুলে পাঠালেও সবসময় স্কুল থেকে বের করে দেয়। দু'জন মিলে সবসময় গুঁতাগুঁতি করে, এটা টিচারের সহ্য হয় না। আবার মোটকা যখন শুটকির মত অন্য কাউকে দেখে, তখন সে ভুল করে তার দিকে হাত বাড়িয়ে চেপে ধরতে নেয়। আর শুটকিও মাঝে মাঝে মোটকার মত অন্যদের নখ দিয়ে অন্যদের খোঁচা দিতে নেয়। কিন্তু সত্যি সত্যি দেয় না। এজন্য টিচার শুধু তাদের বের করে দেয়। তাদের বাবা তো মহা সমস্যায় পড়ল। কী করবে? হঠাৎ সে একটা বুদ্ধি পেল। সে বলল, "যে করেই হোক, দু'জনকে সেইম সাইজের করতে হবে। কিন্তু কিভাবে করব?" এরপর সে একটা বই পেল। বইতে লেখা, "বেশি মোটা হওয়া ভাল নয়, এজন্য কেউ বেশি মোটা হয়ে গেলে খাওয়া কমাতে হবে আস্তে আস্তে। আর বেশি শুটকি হওয়াও ভাল নয়, সেজন্য বেশি বেশি খেতে হবে।" তাদের বাবা এই বইটা পেয়ে অনেক খুশি হলো। সে এক কাজ করল। দু'জনের থালা বদলে দিল। শুটকির কম খাবার দিয়ে দিল মোটকার পাতে, আর মোটকার বেশি খাবার দিয়ে দিল শুটকির পাতে। যাই হোক, তারা তাদের বাবার কথা অমান্য করতে পারবে না, কিন্তু "দু'জন ঝগড়া বা মারামারি করো না"- এই কথাটা সবসময় অমান্য করে, যেহেতু এটা তাদের অভ্যাস। তারপর মোটকা ছেলেটি বাবাকে জিজ্ঞেস করল, "এ কি? শুটকির থালা আমায় আর আমার থালা শুটকিকে, ব্যাপারটা কি? এত কম খাবার খেয়ে আমি থাকব কি করে, শুনি?" তখন তার বাবা যাতে তার ছেলেরা খায়, এজন্য একটি মিথ্যে কথা বলল। সে বলল, "কম খেলে নাকি বেশি মোটা হওয়া যায়। যাতে তুমি শুটকিকে আরো বেশি করে হারিয়ে দিতে পার। আর শুটকি যদি এখন থেকে বেশি খাবার খায়, তাহলে সে আরো বেশি শুটকি হয়ে যাবে, একেবারে মাইক্রোস্কোপ দিয়েও দেখতে পাবে না। আর অত যদি ছোট হয়, তাহলে ওর গুঁতা তুমি পাবে কি করে? খেয়ে নাও।" মোটকা ছেলেটি তো খুশি হয়ে বাবাকে বলল, "ঠিক আছে, আমার পাত থেকে আরো ক'টা খাবার নিয়ে শুটকিকে দিয়ে দাও।" বাবা খুশি হয়ে তাই করল। শুটকি আবার বলল, "এহ! কী বল? আমি নাকি মাইক্রোস্কোপ দিয়েও দেখার যোগ্য হব না, না? আমার পাত থেকে ওকে উঠিয়ে দাও।" তখন বাবা বলল, "আচ্ছা, ঠিক আছে।" এই বলে বাবা সবাইকে সমান দিল। তবে শুটকির থালায় ২% বেশি আর মোটকার থালায় ২% কম। তবে বাবা দুইজনের কানে কানে গিয়েই এখন থেকে বলে যে, "বেশি খেলে শক্তিশালী হবে, আবার কম খেলেও শক্তিশালী হবে।" দুইজনকে দুই রকম কথা বলে। এরকম করতে করতে তার ছেলেরা এক পর্যায়ে সমান হয়ে গেল। এখন তারা আর ঝগড়াঝাটি করতে পারে না। একজন আরেকজনকে গুঁতালে আরেকজন একই শক্তিতে গুঁতায়। কেউ চ্যাপ্টাও হয় না, আবার কেটেও যায় না।

Thursday, July 26, 2018

অহংকার ও ঢংয়ের ফল

এক ছিল একটি বালিকা বিদ্যালয়। সেই স্কুলে অনেক ছাত্রীই পড়ত। তার মধ্যে কয়েকজনের নাম হলো রেহেনা, তাশফিয়া, দিবানিশি এবং মাইশা। তাদের মধ্যে রেহেনাই ছিল বেশি ধনী। তার সাথে সে যেমন ধনী ছিল, তেমনই হিংসুটে ছিল। নিজের কিছু একটা থাকলে অন্যের সেটা না থাকলে অন্যকে সে চেতাতো (ক্ষেপাতো)। একদিন হলো কি, আজকে নতুন ক্লাসে সবার প্রথম ক্লাস। সবাই তৈরি হয়ে এসেছে। রেহেনা সবাইকে জিজ্ঞেস করল, "এই! তোরা সবাই টিফিনে কী এনেছিস? বল দেখি!" তাশফিয়া বলল, "আমার কি আর তোর মত সৌভাগ্য রে? আমরা তো গরীব। তাই কী আর আনব? তেমন কিছুই নয়। শুধু তিন টুকরো গাজর। যা পেড়েছিলাম আর কি।" এরপর দিবানিশি বলল, "তুই বুঝি খুব ভাল টিফিন এনছিস, রেহেনা? আমি তো কিছুই আনতে পারলাম না। দেখি, এখন কী করা যায়। তবে ছোট্ট একটা খেজুর আমার সাথেই আছে। এতেই আমার হয়ে যাবে।" শেষে মাইশা বলল, "আমি আর কী আনব? আমি তো কিছু আনতেই পারলাম না। শুধু একটা মাত্র মটরশুটি। যা আমাদের পাশের বাড়ির ফুপু দিয়ে গিয়েছে।" রেহেনা সবার কথা শুনে হাসতে লাগল আর তামাশা করতে লাগল। বলতে লাগল, "এ মা! তাশফিয়ার বুঝি তিন টুকরো গাজর খেয়েই পেট ভরে যাবে! ছি! তোরা আমার ধারেকাছেও নস। দিবানিশি! শোন্, তুই নাকি ঐ ছোট্ট একটা মাত্র খেজুর খেয়ে ৯ ঘন্টা থাকবি। আশ্চর্য তো? কিছু নেই, নাকি? এত গরীব জীবনে দেখিনি। আর মাইশা, তুই কী রে! পাশের বাড়ি থেকে ক'টা মটরশুটি দিল, তা থেকে মাত্র একটা কেন আনলি? আশ্চর্য তো! আমার তো ১০০ টা মটরশুটি খেলেও হবে না। ধূত! এত গরীবের বন্ধু কি করে হলাম?" তাশফিয়া বলল, "রেহেনা! এত অহংকার ভাল না। তুই কি এনেছিস, সেটা আগে শুনি দেখি। এত যখন কথা বলছিস! বল্ কি এনেছিস?" রেহেনা বলল, "কী রে বাবা! এটুক ধারণাও নেই? এনেছি তো ১০টা চিকেন রোল, ২ বাটি বিরিয়ানি, মাছের মাথা এবং মাছের ডিমসহ মাছের ভাল ভাল পিস, দুই টুকরো রোস্টও সাথে এনেছি। আরো একটা ডিম পোচ। ভাবছিস কি, মাত্র এইটুকু এনেছি? আরো কত যে বাকি রইল বলা। হোটেলের ভেজিটেবল এনেছি। তার সাথে এনেছি একটা বড় পিজা। আবার দুটো বার্গার, তিনটি হটডগ। আর এনেছি এক বোতল কোল্ড ড্রিংকস। তোদের কথা ভাবলেই আমার ঘৃণা করে। তোরা আমার সাথে পড়িস? কী একটা ছোট খেজুরের টুকরো, তা খেয়ে নাকি ৯ ঘন্টা থাকবে? আর হ্যাঁ, এক প্যাকেট মাশমেলোজও কিন্তু এনেছি।" দিবানিশি আবার গরীব হলেও একটু কথা জানত। সে বলল, "এই জন্যই তো বলি, ব্যাগ ভারি, এত বই-খাতা আনিস, তাও পরীক্ষায় বারবার ফেল করিস। ব্যাগ কেন এত ভারি, এখন বুঝলাম। তুই ব্যাগ ভরে শুধু টিফিন আনিস। আর বই-খাতা কোনরকম বটলি পাকিয়ে যত কম নেয়া যায়, তত চেষ্টা। দেখি তোর ব্যাগটা? এ মা, তোর ব্যাগে তো পাঁচটা পার্ট। চারটা পার্টই দেখি জমিয়ে খাবার ঢুকিয়েছিস। আর একটাতে কোল্ড ড্রিংস, আর পানির বোতল, আর ছোট্ট একটা খাতা, আর কুট্টি একটা পেন্সিল; আর কিছু তো না! তোর পেট সত্যি তোর পেট তো, নাকি কোন রাক্ষস এসে পেট বদলে দিয়ে গেছে?" রেহেনা রাগের চোটে বলল, "এখন আমি খাব, জ্বালাবি না। এনেছে কতটুক একটু টিফিন, আবার ঝগড়া বাধায়। বুঝিস না, আমার সাথে ঝগড়া করলে কি হতে পারে, জানিস? আমার বাবা কী, জানিস? আমার মা কি, তাও তো জানিস না। বাবা আদালতে কাজ করে, আর মাও আদালতে কাজ করে। আমার মা-বাবা কিন্তু টিপে ভর্তা করে দিতে পারে তোদের। এখন কথা বলিস না, যা, যা। আমি এখন সব টিফিন বের করব। আমার তিনটা বেঞ্চ লাগবে টিফিনগুলো রাখতে। তোরা উঠে তোদের সিট দিয়ে যা। গরীবের আবার বসে বসে খেতে হবে নাকি? এত যখন কষ্ট সহ্য করিস, এটুক করবি না? যত্তসব!" সবাই আর কী বলবে? তারাও জায়গা ছেড়ে দিল। তার খাবার ব্যাগ থেকে বের করে বেঞ্চে রাখতে রাখতেই তো আধা ঘণ্টার দশ মিনিট পেরিয়ে গেল। তো কি? সে দুই সেকেন্ডেই সব খাবার শেষ করে দিতে পারবে। তার যা চালু মুখ আর চালু পেট। সে সবার আগে মাশমেলোজের পুরো প্যাকেটটাই মুখের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। দুই সেকেন্ড পর মুখ থেকে খালি প্যাকেট বের করে আনল। এরপর দু'মিনিটে গপাগপ করে মাছ, মাংস ও ডিম খেয়ে ফেলল। আর এক মিনিটে দুই বাটি বিরিয়ানিও শেষ করে ফেলল। তারপর গবগব করে সবগুলো চিকেন রোলই খেয়ে ফেলল। তারপর ভেজিটেবল খেল। তারপরও সে বলল, "খিদেটা তো কিছুতেই যাচ্ছে না। কি যে করি, এখনো তো অনেক খাবারই রয়ে গেছে, সে সবই খাই। সে কোল্ড ড্রিংস গবগব করে সবটা খেয়ে ফেলল। এরপর গোটা পিজাটা সে মুখের ভিতর ঢুকিয়ে দু' সেকেন্ডেই তাড়াতাড়ি চাবিয়ে গিলে ফেলল। এরপর সে আধা মিনিটে দুটো হটডগ খেয়ে ফেলল। সব খাবারই সে চেটেপুটে এরপর খেয়ে নিল। তারপর পানি খেয়ে রেখে তবেই উঠল। সে বলল, "ইস! কেন যে এত্ত কম খাবার দিল? ছিছিছিছি, মান-সম্মান আর কিছু থাকল না। আনার কথা ১০০ ভাগ। ১০০ ভাগের মাত্র দুই ভাগ দিয়েছে আজকে টিফিনে। আরো তো খেতে ইচ্ছে করছে, কী খাব? সে গেল। গিয়ে বলল, "তোদের প্রত্যেকের টিফিনের চার ভাগের তিন ভাগ আমায় দিয়ে দাও, দিয়ে দাও বলছি? নইলে আমার বাবা-মা কিন্তু আদালতে নিয়ে গিয়ে কঠিন শাস্তি দেবে। দাও, বলছি!" তখন সবাই বলল, "এহ! কি বলিস কি? তুই পেট ভরে খেতে থাকবি, আর আমরা বসে বসে দেখব? আমরা ততক্ষণে কবেও খাবার শেষ করেছি!" এরপর রেহেনা খুব রেগে গেল। বলল, "১০০ ভাগের ৫০ ভাগ অন্তত আমায় খেতে হবে। মা কত টিফিন আমায় দিতে হবে, তাও বোঝে না। কিনে তো দিয়েছে শুধু একটা লাগেজ ব্যাগ, সেই লাগেজ ব্যাগে করেই যতটুকু ভরে, ততটুকু টিফিন দেয়। উহ! এখন যে কী করি?" ভাবতে ভাবতে সে একটা বুদ্ধি পেল। টিচার তো একটা ব্যাগ তার হ্যান্ডব্যাগের সাথে পিনআপ করে রেখেছে। তার ব্যাগের মধ্যে ছিল অনেকগুলো টি-ব্যাগ। আর ছিল এক বড় প্যাকেট আইসিং সুগার। টিচার আবার একটু ঢঙ্গু ছিল। শুধু সুগার দিলে গলতে শুরু করে, এজন্য সে আইসিং সুগার ব্যবহার করে। রেহেনা গিয়ে চুপে চুপে তাড়াতাড়ি আইসিং সুগারের প্যাকেটটা নিয়ে নিল। সব আইসিং সুগার একবারে মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। তারপর বলল, "উহ, বাবা! ১০০% এর ২০% তো খাওয়া হলো। এবার বরং সিটে বই-খাতা নিয়ে বসি। অন্য বন্ধুরা তো খাওয়া শেষ করে লেখাও শেষ করে খাতা জমা দিয়ে দিয়েছে। আমি তো বোর্ডেরটাই শুরু করিনি, নিজে যেটা লিখতে হবে সেটা কখন লিখব? সে তাড়াতাড়ি করে খাতা বের করে লিখতে শুরু করল। ঘন্টা বাজল। কিন্তু লেখা শেষ হলো না রেহেনার। সে শুধু বারবার ঘুমিয়ে পড়ছিল। টিচার এসে এসে তাকে ডেকে দিচ্ছিল। সব বন্ধুরা তো রেহেনা যখন দেখছিল না, তখন তাকে দূর থেকে একটু ভেংচি কেটে চলে গিয়েছিল। রেহেনা তো লিখতেই পারছে না। অবশেষে এক ঘন্টা পর সে বোর্ডের লেখা শেষ করল। এখন নিজে বানিয়ে লেখার পালা। তখন সে টিচারকে বলল, "মিস! শোনেন, আপনি একটু দেখুন তো যে, পাশের ক্লাসে টিচার ঠিকমত ক্লাস নিচ্ছে কিনা! আমার তো মনে হচ্ছে না। কারণ, আগের ক্লাসে ছুটির পর আমি পাশের ক্লাসের বাচ্চাদের দেখেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম পড়া, একটুকুও পারেনি। বোধহয় ঠিকমত পড়াচ্ছে না, গিয়ে দেখুন তো!" ক্লাসের মিস তা দেখতে চলে গেল। এই ফাকে রেহেনা টেবিলে গিয়ে অন্যদের রাখা খাতাগুলো দেখে নিল। সে একটা খাতা পট করে নিয়ে নিজের স্কার্টের ভিতর লুকিয়ে নিল। যখনই সে পারে না, তখনই সে স্কার্টটা একটু উঁচু করে দেখে আবার স্কার্টটা ঠিক করে দেয়। হঠাৎ তার লেখা শেষ হলো। সে নিজের খাতার নিচে আরেকজনের খাতাটা রেখে টিচার যখন খেয়াল করছিল না, তখন পট করে গিয়ে জমা দিল। টিচার তাকে ছুটি দিয়ে দিল। রেহেনা বাসায় ফিরে গেল। সেই যে সে পুরো এক প্যাকেট আইসিং সুগার খেয়েছিল, সেই জন্য হল তার ডায়াবেটিস। তার পুরো পরিবার ঢঙ্গু হবার কারণে সেই এলাকার সেরা ডাক্তার খোঁজা শুরু করল। তা খোঁজার জন্য লোক পাঠালো। সেইজন্য টাকা গেল। এই ক'টা দিনের জন্য তার মা-বাবাও কিছুটা সময় চাকরি ছেড়ে দিল বাচ্চার দেখাশুনা করার জন্য। সেরা ডাক্তার তো সাধারণ মানুষের ঘরে এসে রোগী দেখতে চাচ্ছে না। সেজন্য এক্সট্রা টাকা দিতে হলো। তার মা-বাবা ঢঙ্গু হবার কারণে অনেক টাকা খরচা গেল। মিষ্টি ওষুধ দিন, সুস্বাদু ওষুধ দিন যাতে খাওয়াতে কষ্ট না হয়, যাতে আগ্রহ করে খায়, আবার যাতে চুরি করেও না খেয়ে ফেলে। ইত্যাদি সুবিধা সব লাভ করতে গিয়ে বেশির ভাগ টাকাই গেল ফুরিয়ে। সেরা ডাক্তার যখন দেখল, মা-বাপ ঢঙ্গু, বেশি টাকা আদায় করা যাবে, তখন সেও আবার চালাকি শুরু করল। ২০০ টাকার কাজ ২০০০ টাকা চাইল। এখন সে তো একটাই ইস্যু দিতে পারব। সেটা হল সেরা ডাক্তারের সেরা চিকিৎসা দেবে, তাতে বেশি দাম দিতে হবে না? এই ইস্যু। এরপর অনেক অনেক টাকা খরচ গেল। এতদিন মা-বাবার আদর পেয়ে পেয়ে রেহেনা আবার খুব লাই পেয়ে গিয়েছিল। সে তখন খারাপ লাগার অভিনয় করতে লাগল, যদিও তার অসুখ সেরে গিয়েছিল, যাতে মা-বাবা চাকরি ছেড়ে তার কাছে সময় কাটায়। এইভাবে তারা গরীব হয়ে গেল। একই সাথে, অন্য বন্ধুরাও কাজ করে করে ধনী হয়ে গেল। আগে রেহানা ও তার বন্ধুদের সাথে যা ঘটেছে, তার পুরো উল্টোই হয়ে গেল। শুধুমাত্র এই ঢংয়ের জন্য আর রেহানার অহংকারের জন্য।